বিষয় সন্ধান

সোমবার, ১৭ ডিসেম্বর, ২০১৮

টেকনো-ফান্ডামেন্টাল-গ্রোথ-ইনভেস্টমেন্ট স্ট্রেটেজি: ক্যান-স্লিম (CANSLIM) কৌশল

মার্কিন উদ্যোক্তা, স্টক ব্রোকার-রিসার্চার ও লেখক উইলিয়াম জে ও’নেইলের সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি ইনভেস্টর বিজনেস ডেইলির প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক। প্রতিটি কর্মক্ষেত্রেই তার সাফল্য নিয়ে বিনিয়োগ মহলে আলোচনা হয়। বেস্ট সেলার ‘হাউ টু মেক মানি ইন স্টকস: আ উইনিং সিস্টেম ইন গুড টাইমস অর ব্যাড’ বইয়ে তিনি সেকেন্ডারি বাজারের ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করে টপ পারফর্মিং শেয়ারগুলোর কিছু কমন বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন। সবচেয়ে ভালো কথা হলো, এ বৈশিষ্ট্যগুলো চোখে পড়ার পর সিংহভাগ ক্ষেত্রেই শেয়ারদরে বড় ও শক্তিশালী ট্রেন্ড দেখা যায়। সাতটি বিষয়কে তালিকাভুক্ত করে তিনি সেগুলোর নামের আদ্যক্ষরকে একত্র করে স্টক পিকিংয়ের বহুল আলোচিত কৌশলটির নাম দিয়েছেন ক্যান স্লিম স্ট্র্যাটেজি (CANSLIM)। ইউরোপ-আমেরিকার পাশাপাশি মুম্বাইয়ের মতো উদীয়মান অর্থনীতির শেয়ারবাজারেও ব্যাকটেস্ট করে দেখা গেছে, বেঞ্চমার্ক সূচকের চেয়ে ক্যান স্লিম স্ক্রিনিংয়ে উঠে আসা শেয়ারগুলোর সূচক অনেক বেশি রিটার্ন দিয়ে যাচ্ছে। ভক্তদের দাবি, ক্যান স্লিম এখন পর্যন্ত এক নম্বর গ্রোথ ইনভেস্টমেন্ট স্ট্র্যাটেজি। তবে অন্য প্রতিটি স্ট্র্যাটেজির মতো ক্যান স্লিমও প্রায়োগিক চ্যালেঞ্জের ঊর্ধ্বে নয়। ও’নেইল ও তার অনুসারীরা সেগুলোর সমাধান নিয়েও কাজ করে চলেছেন।

টেক্সাসে বড় হওয়া উইলিয়াম জে ও’নেইল সাউদার্ন মেথডিস্ট ইউনিভার্সিটির বিজনেস স্কুল থেকে ১৯৫৫ সালে স্নাতক সম্পন্ন করে মার্কিন বিমান বাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৫৮ সালেই তিনি স্টক ব্রোকার হওয়ার জন্য চলে আসেন হেইডেন স্টোন অ্যান্ড কোম্পানিতে। সেখানে কম্পিউটার ব্যবহার করে ইনভেস্টমেন্ট স্ট্র্যাটেজি দাঁড় করানোর কাজ শুরু করেন। দুই বছরের মাথায় হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল তার এ প্রচেষ্টাকে স্বীকৃতি দিয়ে তাদের প্রোগ্রাম ফর ম্যানেজমেন্ট ডেভেলপমেন্টের (পিএমডি) প্রথম ব্যাচে তাকে নিয়ে নেয়। সেখানে গবেষণাধর্মী কাজ থেকেই বেরিয়ে আসে ক্যান স্লিম স্ট্র্যাটেজি। ও’নেইল তার ফার্মের টপ ব্রোকার হয়ে যান। মাত্র ৩০ বছর বয়সে নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জে নিজের জন্য একটি আসন কিনে নেন তিনি।
বিনিয়োগ সহায়ক তথ্য-উপাত্তের শক্তি সম্পর্কে আগেই ধারণা হয়ে গিয়েছিল ভদ্রলোকের। প্রযুক্তির সহায়তায় এগুলোর সহজলভ্যতার জন্যও বিনিয়োগ বাড়াতে থাকেন তিনি। ১৯৬৩ সালেই গড়ে তোলেন উইলিয়াম ও’নেইল কোম্পানি ইনকরপোরেটেড। এ কোম্পানিটিই প্রথম কম্পিউটারাইজড ডেইলি সিকিউরিটিজ ডাটাবেজ গড়ে তোলে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ৭০ হাজারের বেশি কোম্পানি তাদের উপাত্ত ভান্ডারে চলে আসে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা ও’নেইল কোম্পানির উপাত্ত ও রিসার্চ নোটগুলোর জন্য ভালো দাম দিতে শুরু করে। সত্তরের দশকে ও’নেইলের প্রিন্টেড ডেইলি গ্রাফ থেকে শুরু করে এখনকার সময়ের অনলাইন ডাটাবেজ, স্টক স্ক্রিনিং, চার্টিং সবকিছুই সমান জনপ্রিয়।

আশির দশকে এসে ও’নেইল তার রিসার্চ, পর্যবেক্ষণ, মতামত গণমানুষের সঙ্গে শেয়ার করার একটি তাগিদ অনুভব করলেন। ১৯৮৩ সালে উদ্যোগ নেন ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিযোগী ইনভেস্টরস ডেইলি গড়ে তোলার। ১৯৯১ সালে সাত বছরের মাথায় পত্রিকাটির নাম বদলে হয় ইনভেস্টরস বিজনেস ডেইলি (আইবিডি)। ২০১৫ সালে প্রতিদিন ১ লাখ ১৩ হাজারের মতো পত্রিকা ছাপা হচ্ছিল, অনলাইনে মাসে ভিজিটর ছিল আরো প্রায় ৩০ লাখ। বাণিজ্যিক দিক বিবেচনা করে ২০১৬ সালে প্রিন্টিং শিডিউল বদলে সাপ্তাহিক করে দেয়া হয়, আর দৈনিক কনটেন্টগুলো অনলাইন সংস্করণে সীমিত করে দেয়া হয়। একদল পাঠক সাপ্তাহিক প্রিন্ট আর অনলাইন সংস্করণের জন্য মুখিয়ে থাকেন, ব্যক্তিগত জীবনে যাদের একটি বড় অংশই সফল বিনিয়োগকারী কিংবা ইনভেস্টমেন্ট প্রফেশনাল। আইবিডিকে ক্যান স্লিম প্র্যাকটিশনারদের একটি বৈশ্বিক প্লাটফর্ম বললেও ভুল হবে না। ওয়াল স্ট্রিটের বাইরে ভারতের মতো দেশগুলোয় সাবসিডিয়ারি খুলেও ডাটা, রিসার্চ, পাবলিকেশনের ব্যবসা করছে ও’নেইল এন্টারপ্রাইজগুলো। ব্রোকারেজ ব্যবসা, ইনভেস্টমেন্ট পারফরম্যান্স, বিনিয়োগের সঙ্গে তথ্যপ্রযুুক্তির সংযুক্তির বিবেচনায়ও ও’নেইলকে মানুষ মনে রাখবে। তবে অনুসারীদের চোখে তার সেরা কাজ ক্যান স্লিম স্ক্রিনিং।


ক্যান স্লিম অর্থ
C (সি)         —        কারেন্ট কোয়ার্টারলি আর্নিংস
A (এ)          —        অ্যানুয়াল আর্নিংস গ্রোথ
N (এন)        —        নিউ প্রডাক্ট অর সার্ভিস
S (এস)        —        সাপ্লাই অ্যান্ড ডিমান্ড
L (এল)        —        লিডার অর ল্যাগার
I (আই)        —        ইনস্টিটিউশনাল স্পন্সরশীপ/হোল্ডিং
M (এম)       —        মার্কেট ডিরেকশন















ক্যান স্লিম

দীর্ঘদিনের উপাত্ত বিশ্লেষণ করে ও’নেইল দেখেছেন মৌসুমের শীর্ষ উইনার স্টকগুলো ঊর্ধ্বযাত্রা শুরুর সময় বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নিচের উপাদানগুলোকে ক্লু হিসেবে আমাদের সামনে তুলে ধরে। এসব ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তনের আশাই স্টক এক্সচেঞ্জে এসব শেয়ারে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করে এবং বিশেষ কোনো সমস্যা না থাকলে সে শেয়ারে বড় ট্রেন্ড দেখা যায়, যা আমাদের মূলধনি মুনাফা বাড়াতে সহায়ক হয়।

ক্যান স্লিম উপাদানগুলো —

সি— কারেন্ট কোয়ার্টারলি আর্নিংস:
তিন মাস পরপর তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর প্রান্তিক প্রতিবেদন প্রকাশ হয়, যেখানে কোম্পানির বিক্রি, আয়, ব্যয়, সঞ্চিতি, মুনাফা, শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস), শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য, পরিচালন নগদ প্রবাহ সবই থাকে। উপাত্তগুলোয় উল্লেখযোগ্য হারে প্রবৃদ্ধি বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি এড়ায় না। বিষয়টি শেয়ারদরে বড় উত্থানে সহায়ক হওয়ার মতোই। ক্যান স্লিম ইনভেস্টররা মোটা দাগে বলে থাকেন, প্রান্তিক ইপিএসে অন্তত ২৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি থাকতে হবে। ৫০, ১০০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলে সেটি আরো ভালো। তবে অবশ্যই দেখে নিতে হবে, এ প্রবৃদ্ধি কতটা টেকসই। এ প্রবৃদ্ধি এককালীন কোনো আয়-ব্যায়ের ক্যারিশমা নয়, অ্যাকাউন্টিং সাইকেলের ম্যানিপুলেশন নয়, বিলম্বিত হিসাবায়নের গোলকধাঁধা নয়। ২৫-৫০ শতাংশ ইপিএস প্রবৃদ্ধির সাপোর্টে বিক্রিতে ১৫-২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি আশা করেন ক্যান স্লিম ইনভেস্টররা। রিটার্ন অন ইকুইটি, রিটার্ন অন অ্যাসেটের মতো নির্দেশকগুলোতেও সন্তোষজনক ফিগার দেখতে চান তারা।

এ— অ্যানুয়াল আর্নিংস গ্রোথ
ভালো প্রান্তিক ফলাফল অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটি বছর শেষেও অব্যাহত থাকতে হয়। একটি নির্দিষ্ট বছরে চোখ ধাঁধানো উপাত্ত থাকলেই হবে না, বরং প্রবৃদ্ধির কয়েক বছরের একটি ধারাবাহিকতার খোঁজ করতে হবে। ব্যতিক্রম ক্ষেত্রে কোনো কোম্পানি পূর্ববর্তী বছরগুলোর উপাত্তে পিছিয়ে থাকলে তখন অবশ্যই ব্যবসার গুণগত বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করে আগামীতে ধারাবাহিকতার সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করতে হবে। আবার ধারাবাহিকতা থাকলেও ব্যবসার খুঁটিনাটি দেখে বোঝার চেষ্টা করতে হবে, সেখানে বড় কোনো সমস্যা দানা বাঁধছে না, যা কোম্পানিটির আগামীর আর্থিক প্রতিবেদনকে বিনিয়োগকারীর প্রতিকূলে নিয়ে যেতে পারে। অন্তত নিশ্চিত হতে হবে, কোম্পানির পণ্যের চাহিদা কমছে না, ইন্ডাস্ট্রির ট্রেন্ড নেগেটিভ না, কোম্পানির মুনাফার মার্জিন কমার ধারায় নেই এবং কোম্পানির প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যাচ্ছে না।
বলা হয়, পূর্ববর্তী তিন-পাঁচ বছরের মুনাফায় ২৫ শতাংশের বেশি গড় প্রবৃদ্ধি থাকলে বিশ্বের কোনো প্রান্তের কোম্পানিই ক্যান স্লিম স্ক্রিনিংয়ের বাইরে থাকতে পারে না।

সি+= কোয়ান্টিটেটিভ: ক্যান স্লিমের প্রথম দুটি শর্ত কোয়ান্টিটেটিভ স্ক্রিনিং ও বিশ্লেষণের অংশ। তার পরও বুদ্ধিমান বিনিয়োগকারীরা সেখানে কোয়ালিটেটিভ অ্যানালাইসিস যোগ করতে পারেন এবং করেনও। ক্যান স্লিম কোয়ান্টরা বিশ্বাস করেন, টানা তিন-পাঁচ বছর ত্রৈমাসিক ও বার্ষিক প্রতিবেদনে ভুয়া আকর্ষণীয় প্রবৃদ্ধি দেখিয়ে প্রতারণা করা সত্যিই কঠিন। তবে ভারতের সত্যম কম্পিউটার্সের মতো কেসগুলো তাদের দ্বিতীয়বার ভাবতে বাধ্য করেছে নিশ্চয়ই।

এন— নিউ প্রডাক্ট অর সার্ভিস
ক্যান স্লিম ইনভেস্টররা তৃতীয় যে বিষয়টির খোঁজে থাকে, তা হলো কোম্পানিটিতে নতুন কিছু আসতে হবে। সেটি হতে পারে নতুন পণ্য, সেবা, সিইও, পর্ষদ কিংবা ইন্ডাস্ট্রির বাস্তবতা, যা কোম্পানিকে উপকৃত করবে। শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীরা চিরকালই কেন জানি ‘নেক্সট বিগ থিং’য়ের প্রতি কিছুটা পক্ষপাতিত্ব করেন। ইন্ডাস্ট্রির চেহারা বদলে দেয়ার মতো একটি নতুন কোম্পানির প্রতি তাদের আকর্ষণ যেমন বেশি, আবার কোনো কোম্পানি নতুন পণ্য ও সেবার মাধ্যমে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করলেও বিনিয়োগকারীরা সেটিকে আপন করে নেন। এ নতুনের মাধ্যমে কোম্পানির মৌল ভিত্তিতে ব্যাপক উন্নতি করে দেখিয়েছে বিশ্বের হাজারো তালিকাভুক্ত কোম্পানি। আবার শেয়ারবাজারের ইতিহাসে বহু কোম্পানি রয়েছে, যেখানে নতুনের উচ্ছ্বাস শেষ পর্যন্ত ইপিএস ও লভ্যাংশে রূপান্তর হয়নি। তারপরও ক্যান স্লিম নতুনের খোঁজে থাকে, কারণ মূলধনি মুনাফাটি তো আর মিথ্যে কিছু নয়।

এস— সাপ্লাই অ্যান্ড ডিমান্ড
চাহিদা ও জোগানের তত্ত্ব সব ধরনের বাজার কর্মকাণ্ডকে প্রভাবিত করে। শেয়ারবাজারকে কেন নয়? সীমিত জোগানের শেয়ারগুলোর বর্ধিত চাহিদা অবশ্যই দর বৃদ্ধির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আবার চাহিদা পড়ে গেলে ওভার সাপ্লাই কতটা ভয়ানক হতে পারে, তার উদাহরণও আমরা জানি। ক্যান স্লিম ইনভেস্টররা স্টক চার্টে প্রাইস প্যাটার্নে দফায় দফায় আকস্মিক উত্থান আর বড় ভলিউমের অনুসন্ধান করেন। একটি দর সীমার মধ্যে নির্দিষ্ট বিরতিতে এমন উত্থান ও সংশোধনের ঘটনাগুলো সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি অ্যাকিউমুলেশন নির্দেশ করে। অর্থাৎ আগামীর জন্য কেউ আজকের বাজারে প্রিমিয়াম দিয়ে হলেও শেয়ার জড়ো করছে। বড় উত্থানের আগে এ অনুসিদ্ধান্ত বেশি কার্যকর। আবার দীর্ঘ উত্থানের পর বড় ভলিউমে এমন সিরিজ উত্থান পতন ডিস্ট্রিবিউশন নির্দেশ করে। অর্থাৎ ধারাবাহিক দর বৃদ্ধির পর মুনাফা তুলে নেয়ার চেষ্টা করছেন কেউ কেউ। তাদের কাছ থেকে শেয়ারগুলো কিনে নিয়ে অন্য বিনিয়োগকারীরা ট্রেন্ডটিকে বাঁচিয়ে রাখবেন না— এমন নিশ্চয়তা কেউ দেয় না। তবে সতর্ক হওয়ার একটি আবশ্যকতা রয়ে যায়।

এল— লিডার অর ল্যাগার
‘লিডিং স্টক’ আর ‘ল্যাগিং স্টক’ কথা দুটি আমাদের বাজারে খুব বেশি শোনা যায় না। তবে এখানেও বিষয়গুলোর অস্তিত্ব সমভাবে বিদ্যমান। ওয়াল স্ট্রিটে এগুলো খুব পরিচিত শব্দগুচ্ছ।
ঢাকা-চট্টগ্রামের শেয়ারবাজারে গত দুই দশকের প্রাইস চার্ট পর্যবেক্ষণ করলেও আমরা দেখব, বিভিন্ন খাতের বা গ্রুপের কোম্পানিগুলোর মধ্যে কিছু শেয়ারের দাম সমধর্মী অন্যগুলোর চেয়ে আগে বা বেশি বাড়ে। ইন্ডাস্ট্রির অন্য তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর শেয়ারদর অনেক বেড়ে গেলেও কিছু শেয়ারের দাম একই সীমায় আটকে থাকে। লিডাররা অনেক দূর এগিয়ে যাওয়ার পর হয়তো সেগুলোর দিকে বিনিয়োগকারীদের চোখ পড়ে।
রিলেটিভ স্ট্রেংথ হিসাব করে লিডারদের শনাক্ত করে ক্যান স্লিম স্ক্রিনিং অ্যালগরিদম। বিশ্বের বিভিন্ন শেয়ারবাজারের বুল-বিয়ার চক্রগুলো পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, নিজের ব্যবসায় লিডিং কোম্পানিগুলোই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সেকেন্ডারি বাজারেও লিডার হিসেবে আবির্ভূত হয়। কারণ তারা অন্য ক্যান স্লিম শর্তগুলোতেও বিনিয়োগকারীদের চোখে বেশি আকর্ষণীয়। আমাদের ব্যাংকিং ইন্ডাস্ট্রি, ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্ডাস্ট্রির দিকে তাকালেও কথাগুলোর সত্যতা মিলবে।

আই— ইনস্টিটিউশনাল স্পন্সরশিপ/হোল্ডিং
কারা কোম্পানিটির উদ্যোক্তা, কারা এর বেশির ভাগ শেয়ার ধারণ করছেন, কোম্পানির ব্যবসা উন্নয়নে কোন পক্ষের ভূমিকা কেমন হতে পারে, শেয়ারদর নির্ধারণে তাদের কে, কীভাবে, কতটা ভূমিকা রাখতে পারে, অনুকূল পরিস্থিতিতে কারা শেয়ারের চাহিদা কতটা বাড়াতে পারে, আবার প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কারা ওভার সাপ্লাইয়ের উৎস হয়ে উঠতে পারে— এর সবই সেকেন্ডারি বাজারের বিনিয়োগকারীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের ক্যান স্লিম ইনভেস্টররা একটি কোম্পানিতে অন্তত ১০টি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ আশা করেন।

এম— মার্কেট ডিরেকশন
সব আশায় গুড়ে বালি, যদি মার্কেট ডিরেকশন তথা বাজারের মূল দিকমুখিতা আপনার প্রতিকূলে থাকে। পরিসংখ্যানের ভিত্তিতেই ও’নেইল ও তার ভক্তরা বলে থাকেন, বুল মার্কেটে তিন-চতুর্থাংশ শেয়ারের দরই শেষ পর্যন্ত বাড়ে। আর বিয়ার মার্কেটে ঠিক উল্টোটা। আমাদের বাজারে এ হার সম্ভবত আরো বেশি।
আপনার শেয়ারটি তিন-চতুর্থাংশের দলে না এক-চতুর্থাংশের দলে থাকবে, তা বিশ্লেষণসাপেক্ষ বিষয়।

ক্যান স্লিম রিটার্ন রেকর্ড
আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিভিজুয়াল ইনভেস্টরস ২০১০ সালে একটি স্টাডির ফল প্রকাশ করে, যেখানে দেখা যায়, ১৯৯৮ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত আপডেটেড ক্যান স্লিম সিস্টেমে বাছাই করা শেয়ারগুলোর পোর্টফোলিও থেকে ২৭৬৩ শতাংশ রিটার্ন এসেছে। ২০০৮-০৯ সময়ের ধসসহ মধ্যবর্তী সব উত্থান-পতন মিলিয়ে যেখানে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকের রিটার্ন ছিল ১৪ দশমিক ৯ শতাংশ। ক্যান স্লিম পোর্টফোলিওর গড় বার্ষিক রিটার্ন ছিল ৩৫ দশমিক ৩ শতাংশ। স্টাডিতে ৫০টি শীর্ষ ইনভেস্টমেন্ট স্ট্র্যাটেজির ব্যাকটেস্ট করেছিল অ্যাসোসিয়েশনটির রিসার্চ টিম। এর মধ্যে ক্যান স্লিম পোর্টফোলিওর গড় বার্ষিক রিটার্নই ছিল সর্বোচ্চ।

২০০৩ সাল থেকে ক্যান স্লিম স্ক্রিনিংয়ে টপ ৫০টি শেয়ারের একটি সূচক প্রকাশ করে আসছে আইবিডি। এক চার্টে দেখা গেছে, ২০০৩-২০১৫ সময়ে ক্যান স্লিম স্টকগুলোর সূচক আইবিডি ৫০ প্রতি বছর গড়ে ১৮ শতাংশ হারে রিটার্ন দিয়েছে, যা ওয়াল স্ট্রিটের বেঞ্চমার্ক সূচক এসঅ্যান্ডপি ৫০০ এর চেয়ে তিন গুণ। ২০১৫ সালের এপ্রিলে ইনোভেটর ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট নামের একটি প্রতিষ্ঠান ‘ইনোভেটর আইবিডি ৫০ ইটিএফ’ নামের একটি এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড চালুর মতো সাহসী পদক্ষেপ নিয়ে নেয়। ওয়াল স্ট্রিটের রেকর্ড উত্থানের কারণে প্রথম দুই বছর ইটিএফটি এসঅ্যান্ডপি ৫০০ এর চেয়ে পিছিয়ে ছিল। তবে ২০১৭ সালে এসে আইবিডি৫০ ইটিএফ সর্বোচ্চ ৪২ শতাংশ রিটার্ন দেখানোয় ক্যান স্লিমের আবেদন আবারো অনেক বেড়ে যায়।

এখন ভারতেও ব্যবসা করছে ও’নেইল কোম্পানিগুলো। ২০১৪ থেকে ২০১৭ সময়ে তাদের ভারতীয় ক্যান স্লিম সূচক ‘মার্কেট স্মিথ ইন্ডিয়া পারফরম্যান্স ইনডেক্সের’ গড় বার্ষিক রিটার্ন (কম্পাউন্ড) ছিল ২২ শতাংশ, যেখানে নিফটি সূচক বেড়েছে ১১ শতাংশ হারে।
কারণ হিসেবে ভারতের অনেক বিশ্লেষকও বলছেন, ক্যান স্লিম গ্রোথ শেয়ারগুলোকে শনাক্ত করার খুব কার্যকর ও শক্তিশালী কিছু শর্ত সেট করেছে। এ স্ট্র্যাটেজি শেয়ারের বর্তমান ইনট্রিনজিক ভ্যালু বা অন্তর্নিহিত মূল্য নিয়ে যতটা সিরিয়াস, তার চেয়ে সিরিয়াস আগামীতে ইনট্রিনজিক ভ্যালু বৃদ্ধির ক্লুগুলো নিয়ে। উপরন্তু যাদের সক্রিয়তায় বাজারে শেয়ারগুলোর দাম বাড়ে তাদের প্রস্তুতি, সম্ভাব্য অ্যাকশনও সিলেকশন ক্রাইটেরিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শেয়ারদর ওঠানামার কিছু ভালো ক্লু নিয়ে বিবেচনার তালিকায় যোগ দিয়েছে টেকনিক্যাল চার্টও।

ক্যান স্লিমের সঙ্গে অন্য কৌশলগুলোর পার্থক্য
কন্ট্রারিয়ান ভ্যালু ইনভেস্টমেন্টের সঙ্গে ক্যান স্লিমের মূল পার্থক্য হলো, ক্যান স্লিম মূলত বড় উত্থানের প্রথম ভাগে এন্ট্রি পয়েন্ট নির্দেশ করে, যেখানে কন্ট্রারিয়ানরা আরো অনেক কম দামে কেনার সুযোগ পান। অন্যদিকে সলিড ট্রেন্ড ট্রেডারদের সঙ্গে ক্যান স্লিমের পার্থক্য হলো, ক্যান স্লিম মৌল ভিত্তিতে বিদ্যমান চ্যাম্পিয়ন কিংবা অন্য কোম্পানিগুলোর মৌল ভিত্তিতে শক্তিশালী পরিবর্তনগুলোরও অনুসন্ধান করে।
ভাষ্যকাররা তাই ক্যান স্লিম মেথডকে বলে থাকেন ‘টেকনো-ফান্ডামেন্টাল গ্রোথ ইনভেস্টমেন্ট স্ট্র্যাটেজি’।

ক্যান স্লিম নিয়ে সতর্কতা
সমালোচনা আছে, ক্যান স্লিম মূলত বুল মার্কেট স্ট্র্যাটেজি। বাজারের ডিরেকশন প্রতিকূলে থাকলে ক্যান স্লিম স্টক পিকিংয়ের ফল সন্তোষজনক নয়। বিষয়টি ক্যান স্লিমের শেষ শর্তেও প্রতিফলন হয়। তবে বিয়ার মার্কেটে ক্যান স্লিম ইনভেস্টররা পুরো বিষয়গুলোকে উল্টে দেখেন এবং সেখানেও ভালো বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ তাদের সামনে এনে দেয় ক্যান স্লিম।
আরেকটি বিষয় হচ্ছে, গ্রোথ ইনভেস্টমেন্ট কৌশল হওয়ায় ক্যান স্লিম শেয়ারবাজারে বটম হান্টিংয়ের চেষ্টা করে না। দর যখন একটি রেঞ্জ ভেঙে বড় উত্থানের ইঙ্গিত দেয়, সাধারণত তার আগে ক্যান স্লিম সেখানে এন্ট্রি নির্দেশ করে না। এক্ষেত্রে শর্ত পরিপালনে কোথায় ফাঁক থাকলে কিংবা সেকেন্ডারি বাজার প্রতিকূল আচরণ করলে ক্যান স্লিম পোর্টফোলিওতে লোকসান দেখাতে পারে। এমন লোকসানকে সীমিত রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন ও’নেইল নিজেই। মোটা দাগে ৮-১০ শতাংশ সীমার মধ্যে স্টপ লস সেট করার একটি কঠোর নির্দেশনা থাকে ক্যান স্লিম ইনভেস্টমেন্ট টিমগুলোয়। নতুবা সত্যম কম্পিউটারের মতো ফাঁদগুলো এড়ানো যায় না। যেসব বাজারে ভলাটিলিটির রেকর্ড তুলনামূলক বেশি, সেখানে স্টপ লস সেটিংয়ে মুনশিয়ানা দেখানোর সুযোগ আছে বৈকি।

লেখক: মাহফুজ উল্লাহ বাবু,
ইনভেস্টোপিডিয়া, ইকোনমিক টাইমস, আইবিডি অবলম্বনে
মূল লেখা  এখানে   

শুক্রবার, ৩০ নভেম্বর, ২০১৮

বিনিয়োগকারীর পাঠশালা-৪ পোর্টফলিও গঠন







এক জন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীর জন্য সুষম পোর্টফলিও গঠন অতন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারন একটি সুষম পোর্টফলিও যেমন উঠতি বাজারে বিনিয়গকারীকে ভাল মুনাফা দিয়ে থাকে ঠিক তেমনি পড়তি বাজারে অত্যধিক লোকসান থেকে সুরক্ষা দিয়ে থাকে। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের পুঁজির পরিমাণ যেহেতু অনেক কম তাই চাইলেও তাদের পক্ষে বাজারে ট্রেড হওয়া সব কম্পানি দূরে থাক তাদের নূন্যতম দশ ভাগ কেনা সম্ভব নয়। আমাদের বাজারে কম্পানির সংখ্যা যেখানে ৩৭১ টি সেখানে এক জন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী সাধারণত ৩/৪ টি কম্পানির শেয়ার তার পোর্টফলিওতে রাখেন।
বর্তমানে আমাদের বাজারে ২১ টি সেক্টরে ৩৭১ টি কম্পানি রয়েছে যার ৩২০-৩৩০ টি নিয়মিত ট্রেড হয়। বাজারের সব শেয়ার যেমন একই সময়ে উর্ধমুখী হয় না ঠিক তেমনি সব সেক্টরই একই সময়ে বাজারে নেতৃত্ব দেয় না। আবার ১০/১৫ টি কম্পানি ছাড়া সবগুল কোম্পানিই মূলত দুটি প্রাধান ডিভিডেন্ড মৌসুমকে কেন্দ্র করে মূল্য পরিবর্তন করে। এক জন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীর পোর্টফলিও তাই এমন হওয়া উচিত যেন তা বাজারের এই সকল ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্টকে কম বেশি ধারন করতে পারে।
ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী তারাই যাদের পুঁজির পরিমাণ ১ কোটি টাকার নিচে, তবে আমাদের দেশের অধিকাংশ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীর পুঁজি ১০ লক্ষ টাকার ও কম। তাই আমি স্টেন্ডার্ড হিসেবে ১০ লক্ষ টাকার একটি পোর্টফলিও গঠন করতে যাচ্ছি। যাঁদের পুঁজি ৫-৫০ লাখ টাকার মধ্যে তদের জন্যে ও একই কৌশল প্রযোজ্য শুধু টাকার পরিমাণটি কম বেশী হবে।
পোর্টফলিও গঠন কৌশলঃ
  • রুল-১ প্রথমেই মোট পুঁজির ২০% আলাদা করুন। এই টাকা সব সময় মেচ্যুর্ড ক্যাশ হিসেবে আপনার বিও একাউন্টে থাকবে। এটি হল জরুরী নিরাপত্তা তহবিল। বাজরে সৃষ্টি হওয়া হটাৎ সুযোগ, রাইট/প্রাইমারি শেয়ারে আবেদন অথবা বিনিয়োগকৃত শেয়ারের দাম অস্বাভাবিক রকম কমে গেলে জরুরী তহবিল ব্যবহৃত হবে। ব্যবহারের ফলে ত্হবিল কমে গেলে নতুন ক্যাশ যোগ করে অথবা পোর্টফলিও তে লাভে থাকা শেয়ার বিক্রি করে যথাসম্ভব দ্রুত তহবিলের পরিমাণ আগের অংকে ফিরিয়ে আনতে হবে।
  • রুল-২ পোর্টফলিও তে নুন্যতম ২ থেকে ৪ টি সেক্টরের শেয়ার থাকতে হবে আর মোট কম্পানির সংখ্যা হবে ৬ থেকে ১০ টি। তবে কোন ভাবেই যেন কম্পানি সংখ্যা ১২ টির বেশি না হয়। ১ থেকে ১০ লক্ষ টাকার পোর্টফলিওতে ৩ থেকে ৪ টি, ১০ থেকে ৩০ লক্ষ টাকার পোর্টফলিওতে ৪ থেকে ৬ টি,৩০ থেকে ৫০ লক্ষ টকার পোর্টফলিওতে ৬ থেকে ৮ টি এবং ৫০ লক্ষ থেকে ১ কোটি টাকার পোর্টফলিওতে ৮ থেকে ১২ টি কোম্পানির শেয়ার থাকতে পারে।
  • রুল-৩ পোর্টফলিও তে থাকা কম্পানির সংখ্যা ৪ অথবা ১২ যাই হোক না কেন প্রতিটিতেই বিনিয়গকৃত টাকার পরিমাণ সমান বা খুব কাছাকাছি হতে হবে। কম্পানি ভেদে টাকার পরিমানে অত্যধিক গড়মিল হলে বিপদ ঘটতে পারে। বেশি বিনিয়োগ থাকা শেয়ারটির দাম পড়ে গেলে জরুরী তহবিলের টাকায় শেয়ার কিনে যেমন গড় ক্রয় মূল্য কমানো যাবে না তেমনি অন্য শেয়ারগুলর লাভ দিয়েও ঐ ক্ষতি পূরণ করা যাবে না। তাই প্রতি শেয়ারে বিনিয়গের পরিমাণ সমান বা খুব কাছাকাছি রাখুন।
  • রুল-৪ আপনার পুঁজির উপর ভিত্তি করে শেয়ার বাছাই করুন। পুঁজির পরিমাণ ৩ লক্ষ টাকার কম হলে ৫০/৬০ বা তার নিম্ন মূল্যমানের শেয়ার, ৫ লক্ষ টাকার কম হলে ২০০/২৫০ বা তার নিম্ন মূল্যমানের শেয়ার আর ১০ লক্ষ টাকার কম হলে ৫০০/৫৫০ বা তার নিচের মূল্যে লেনদেন হওয়া ফান্ডামেন্টালি ভাল কম্পানির শেয়ার টার্গেট করুন।
  • রুল-৫ পোর্টফলিও তে থাকা কম্পানির সংখ্যা যাই হোক না কেন তার অর্ধেক জুন ক্লোজিং ও বাকি অর্ধেক যেন ডিসেম্বর ক্লোজিং হয় তা নিশ্চিত করুন।
১০ লক্ষ টাকার পোর্টফলিও
প্রথমেই ১০ লক্ষ  টাকার ২০ ভাগ মানে ২ লক্ষ টাকা জরুরী তহবিলে রাখুন। বাকি টাকা সমান চার ভাগে ভাগ করুন। তাহলে প্রতি ভাগে পড়বে ২ লক্ষ টাকা। এই টাকায় মোট ৪ টি ভিন্ন ভিন্ন কম্পানির শেয়ার কিনুন। এই চারটি কোম্পানি যেন দুইটি সেক্টর থেকে আসে এবং দুটি যেন জুন ক্লোজিং ও বাকি দুটি টি যেন ডিসেম্বর ক্লোজিং হয়।