পুঁজিবাজারে একজন খাঁটি ভ্যালু ইনভেস্টর বা মৌল-ভিত্তিক বিনিয়োগকারীর মূল মন্ত্র হলো—ফান্ডামেন্টালি স্ট্রং বা শক্তিশালী মৌল ভিত্তির কোম্পানিগুলো যখন কোনো কারণে ৫০-৬০% ডিপ ডিস্কাউন্টে (কম দামে) পাওয়া যায়, তখন তা লুফে নেওয়া। তবে এই ডিস্কাউন্টে থাকা শেয়ারগুলোর প্রাইস রিকভারি বা দাম পুনরুদ্ধার কিন্তু এক রাতে হয় না। এটি কয়েক ধাপে, অনেক ওঠানামার (Waves/Swings) মধ্য দিয়ে অবশেষে তার প্রকৃত লক্ষ্যে পৌঁছায়।
অধিকাংশ বিনিয়োগকারী এই দীর্ঘ সময়ে ধৈর্য হারিয়ে ফেলেন। কিন্তু স্মার্ট বিনিয়োগকারীরা এই ওঠানামাকেই হাতিয়ার বানিয়ে পোর্টফোলিওর রিটার্ন বাড়িয়ে নেন। এই কাজে তারা যে কৌশলটি অনুসরণ করেন তা হলো "কোর অ্যান্ড স্যাটেলাইট স্ট্র্যাটেজি" (Core and Satellite Strategy) ।
কোর অ্যান্ড স্যাটেলাইট স্ট্র্যাটেজি কী?
এই স্ট্র্যাটেজিতে আপনার নির্দিষ্ট শেয়ার হোল্ডিং কে দুটি সুনির্দিষ্ট ভাগে ভাগ করা হয়:
কোর পজিশন (Core Position - ৮০%): আপনার মোট শেয়ারের সিংহভাগ (ধরা যাক ৮০%) থাকবে একদম নিরাপদ। শেয়ার তার প্রকৃত ফেয়ার ভ্যালু বা পূর্ব নির্ধারিত লং-টার্ম টার্গেটে না পৌঁছানো পর্যন্ত এই অংশটি কোনো অবস্থাতেই স্পর্শ করা যাবে না। এটি আপনার দীর্ঘমেয়াদী সম্পদ বৃদ্ধি করবে।
স্যাটেলাইট পজিশন (Satellite Position - ২০%): বাকি ২০% শেয়ার আপনি বাজারের টেকনিক্যাল অ্যানালিসিস (সাপোর্ট, রেজিস্ট্যান্স, RSI ইত্যাদি) দেখে ছোট ছোট সুইং ট্রেড করবেন। প্রাইস যখন রেজিস্ট্যান্সে যাবে তখন এই ২০% বিক্রি করে প্রফিট নেবেন, আবার সাপোর্টে আসলে বাই-ব্যাক করবেন।
সুইং হাই-তে বিক্রির পর দাম আরও বাড়লে করণীয় কী?
সুইং ট্রেডারদের সবচেয়ে বড় ভয় হলো—"রেজিস্ট্যান্সে ২০% শেয়ার বিক্রি করে দেওয়ার পর দাম আরও বেড়ে যায় এবং পুনরায় কম দামে কেনার সুযোগ না পাই, তখন কী হবে?" একজন পেশাদার বিনিয়োগকারী হিসেবে এই পরিস্থিতিতে FOMO (Fear of Missing Out) বা আফসোসে না ভুগে ৩টি প্রফেশনাল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন:
১. ব্রেকআউট রিটেস্ট (Breakout Retest) এর অপেক্ষা: শেয়ারের দাম কখনো সোজা লাইনে বাড়ে না। স্ট্রং রেজিস্ট্যান্স ভেঙে ওপরে চলে গেলে কিছুদিন পর দাম কিছুটা কারেকশন হয়ে সেই পুরনো রেজিস্ট্যান্সে (যা এখন নতুন সাপোর্ট) ফিরে আসে। সেই রিটেস্ট লেভেলে ২০% ক্যাশ দিয়ে পুনরায় এন্ট্রি নিন।
২. অন্য আন্ডারভ্যালুড শেয়ারে শিফট হওয়া: যে শেয়ার টুকু হাত থেকে ছুটে গেছে, সেটি এখন প্রিমিয়াম জোনে। জোর করে সেখানে না ঢুকে, আপনার ২০% বিক্রির ক্যাশ টাকা দিয়ে মার্কেটের অন্য কোনো চমৎকার ফান্ডামেন্টাল শেয়ার—যা বর্তমানে ৫০-৬০% ডিস্কাউন্টে আছে—সেটিতে ইনভেস্ট করুন।
৩. কোর হোল্ডিংকে লক্ষ্যে পৌঁছাতে দেওয়া: যদি শেয়ারটি আর নিচে না নামে, তবে ধরে নিন এই সাইকেলের জন্য আপনার সুইং পার্ট শেষ। বাকি ৮০% কোর হোল্ডিং যেভাবে আছে সেভাবেই রেখে দিন এবং মূল লং-টার্ম টার্গেটে পৌঁছালে একবারে বিক্রি করুন। আপনি কোনো লস করেননি, বরং প্রফিট বুক করেছেন এবং আপনার ৮০% হোল্ডিং এখনো বড় লাভে আছে!
নতুন বাজার সংস্কার: T+1 এবং স্ক্রিপ্ট নেটিংয়ের প্রভাব
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নতুন নেতৃত্বের অধীনে লেনদেন নিষ্পত্তির সময় T+2 থেকে কমিয়ে T+1 করা এবং ডিএসই-৩০ স্টক সমূহে স্ক্রিপ্ট নেটিং বা ডে-ট্রেডিং (টি+০) চালুর যে সিদ্ধান্ত আলোচনা হচ্ছে, তা এই "কোর অ্যান্ড স্যাটেলাইট" স্ট্র্যাটেজিকে আরও বেশি শক্তিশালী করবে।
ক) ডিপ ডিস্কাউন্টের শেয়ারে লিকুইডিটি বৃদ্ধি
আমাদের বাজারে অনেক ভালো মৌল ভিত্তিক শেয়ার দীর্ঘদিন অলস পড়ে থাকে কারণ সেখানে লিকুইডিটি বা ভলিউম কম থাকে। T+1 এবং ডে-ট্রেডিং চালুর ফলে বাজারে মানি ফ্লো (Money Flow) বা টাকা ঘোরানোর গতি দ্বিগুণ হয়ে যাবে। ফলে আন্ডারভ্যালুড ও শক্তিশালী কোম্পানিগুলোর প্রাইস রিকভারি আগের চেয়ে অনেক দ্রুত গতিতে হতে পারে।
খ) সুইং ট্রেডিং হবে আরও গতিশীল
দ্রুত ক্যাশ ব্যাক: T+1 এর কারণে আপনি সুইং হাই-তে শেয়ার বিক্রি করার মাত্র ১ দিনের মাথায় টাকা ফ্রি পেয়ে যাবেন। ফলে সাপোর্টে দ্রুত বাই-ব্যাক করার সুবিধা পাবেন।
ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা: বাজারের দৈনিক তীব্র ওঠানামার মধ্যেও একই দিনে পজিশন ম্যানেজ বা নেটিং করার সুযোগ থাকায় আপনার সুইং ট্রেডের ঝুঁকি কমে আসবে।
গত ৫-৭ বছর ধরে এই কোর এন্ড সেটেলাইট স্ট্রেটেজি ফলো করে আলহামদুলিল্লাহ সন্তোষ জনক রেজাল্ট পেয়েছি। বাজারের ট্রেডিং সাইকেলে আসতে যাওয়া নতুন পরিবর্তন গুল এই স্টেটেজিকে আরো বেশি কার্যকর করবে বলেই ধারণা করছি।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন