বিষয় সন্ধান

শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬

কোর অ্যান্ড স্যাটেলাইট স্ট্র্যাটেজি: দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ ও সুইং ট্রেডিংয়ের ম্যাজিক সমন্বয়




পুঁজিবাজারে একজন খাঁটি ভ্যালু ইনভেস্টর বা মৌল-ভিত্তিক বিনিয়োগকারীর মূল মন্ত্র হলো—ফান্ডামেন্টালি স্ট্রং বা শক্তিশালী মৌল ভিত্তির কোম্পানিগুলো যখন কোনো কারণে ৫০-৬০% ডিপ ডিস্কাউন্টে (কম দামে) পাওয়া যায়, তখন তা লুফে নেওয়া। তবে এই ডিস্কাউন্টে থাকা শেয়ারগুলোর প্রাইস রিকভারি বা দাম পুনরুদ্ধার কিন্তু এক রাতে হয় না। এটি কয়েক ধাপে, অনেক ওঠানামার (Waves/Swings) মধ্য দিয়ে অবশেষে তার প্রকৃত লক্ষ্যে পৌঁছায়।


অধিকাংশ বিনিয়োগকারী এই দীর্ঘ সময়ে ধৈর্য হারিয়ে ফেলেন। কিন্তু স্মার্ট বিনিয়োগকারীরা এই ওঠানামাকেই হাতিয়ার বানিয়ে পোর্টফোলিওর রিটার্ন বাড়িয়ে নেন। এই কাজে তারা যে কৌশলটি অনুসরণ করেন তা হলো "কোর অ্যান্ড স্যাটেলাইট স্ট্র্যাটেজি" (Core and Satellite Strategy) ।

কোর অ্যান্ড স্যাটেলাইট স্ট্র্যাটেজি কী?
এই স্ট্র্যাটেজিতে আপনার নির্দিষ্ট শেয়ার হোল্ডিং কে দুটি সুনির্দিষ্ট ভাগে ভাগ করা হয়:

কোর পজিশন (Core Position - ৮০%): আপনার মোট শেয়ারের সিংহভাগ (ধরা যাক ৮০%) থাকবে একদম নিরাপদ। শেয়ার তার প্রকৃত ফেয়ার ভ্যালু বা পূর্ব নির্ধারিত লং-টার্ম টার্গেটে না পৌঁছানো পর্যন্ত এই অংশটি কোনো অবস্থাতেই স্পর্শ করা যাবে না। এটি আপনার দীর্ঘমেয়াদী সম্পদ বৃদ্ধি করবে।

স্যাটেলাইট পজিশন (Satellite Position - ২০%): বাকি ২০% শেয়ার আপনি বাজারের টেকনিক্যাল অ্যানালিসিস (সাপোর্ট, রেজিস্ট্যান্স, RSI ইত্যাদি) দেখে ছোট ছোট সুইং ট্রেড করবেন। প্রাইস যখন রেজিস্ট্যান্সে যাবে তখন এই ২০% বিক্রি করে প্রফিট নেবেন, আবার সাপোর্টে আসলে বাই-ব্যাক করবেন।

⚠️ মনে রাখবেন: কোনো অবস্থাতেই সুইং ট্রেডিংয়ের অংশটি ৩০% এর বেশি বাড়ানো যাবে না। কারণ মার্কেট যদি হুট করে বড় ব্রেকআউট দিয়ে ওপরে চলে যায়, তবে আপনি আপনার কম দামে কেনা মূল পজিশনটি হারিয়ে ফেলবেন।

সুইং হাই-তে বিক্রির পর দাম আরও বাড়লে করণীয় কী?

সুইং ট্রেডারদের সবচেয়ে বড় ভয় হলো—"রেজিস্ট্যান্সে ২০% শেয়ার বিক্রি করে দেওয়ার পর দাম আরও বেড়ে যায় এবং পুনরায় কম দামে কেনার সুযোগ না পাই, তখন কী হবে?" একজন পেশাদার বিনিয়োগকারী হিসেবে এই পরিস্থিতিতে FOMO (Fear of Missing Out) বা আফসোসে না ভুগে ৩টি প্রফেশনাল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন:

১. ব্রেকআউট রিটেস্ট (Breakout Retest) এর অপেক্ষা: শেয়ারের দাম কখনো সোজা লাইনে বাড়ে না। স্ট্রং রেজিস্ট্যান্স ভেঙে ওপরে চলে গেলে কিছুদিন পর দাম কিছুটা কারেকশন হয়ে সেই পুরনো রেজিস্ট্যান্সে (যা এখন নতুন সাপোর্ট) ফিরে আসে। সেই রিটেস্ট লেভেলে ২০% ক্যাশ দিয়ে পুনরায় এন্ট্রি নিন।

২. অন্য আন্ডারভ্যালুড শেয়ারে শিফট হওয়া: যে শেয়ার টুকু হাত থেকে ছুটে গেছে, সেটি এখন প্রিমিয়াম জোনে। জোর করে সেখানে না ঢুকে, আপনার ২০% বিক্রির ক্যাশ টাকা দিয়ে মার্কেটের অন্য কোনো চমৎকার ফান্ডামেন্টাল শেয়ার—যা বর্তমানে ৫০-৬০% ডিস্কাউন্টে আছে—সেটিতে ইনভেস্ট করুন।

৩. কোর হোল্ডিংকে লক্ষ্যে পৌঁছাতে দেওয়া: যদি শেয়ারটি আর নিচে না নামে, তবে ধরে নিন এই সাইকেলের জন্য আপনার সুইং পার্ট শেষ। বাকি ৮০% কোর হোল্ডিং যেভাবে আছে সেভাবেই রেখে দিন এবং মূল লং-টার্ম টার্গেটে পৌঁছালে একবারে বিক্রি করুন। আপনি কোনো লস করেননি, বরং প্রফিট বুক করেছেন এবং আপনার ৮০% হোল্ডিং এখনো বড় লাভে আছে!

নতুন বাজার সংস্কার: T+1 এবং স্ক্রিপ্ট নেটিংয়ের প্রভাব

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নতুন নেতৃত্বের অধীনে লেনদেন নিষ্পত্তির সময় T+2 থেকে কমিয়ে T+1 করা এবং ডিএসই-৩০ স্টক সমূহে স্ক্রিপ্ট নেটিং বা ডে-ট্রেডিং (টি+০) চালুর যে সিদ্ধান্ত আলোচনা হচ্ছে, তা এই "কোর অ্যান্ড স্যাটেলাইট" স্ট্র্যাটেজিকে আরও বেশি শক্তিশালী করবে।

ক) ডিপ ডিস্কাউন্টের শেয়ারে লিকুইডিটি বৃদ্ধি
আমাদের বাজারে অনেক ভালো মৌল ভিত্তিক শেয়ার দীর্ঘদিন অলস পড়ে থাকে কারণ সেখানে লিকুইডিটি বা ভলিউম কম থাকে। T+1 এবং ডে-ট্রেডিং চালুর ফলে বাজারে মানি ফ্লো (Money Flow) বা টাকা ঘোরানোর গতি দ্বিগুণ হয়ে যাবে। ফলে আন্ডারভ্যালুড ও শক্তিশালী কোম্পানিগুলোর প্রাইস রিকভারি আগের চেয়ে অনেক দ্রুত গতিতে হতে পারে।

খ) সুইং ট্রেডিং হবে আরও গতিশীল
দ্রুত ক্যাশ ব্যাক: T+1 এর কারণে আপনি সুইং হাই-তে শেয়ার বিক্রি করার মাত্র ১ দিনের মাথায় টাকা ফ্রি পেয়ে যাবেন। ফলে সাপোর্টে দ্রুত বাই-ব্যাক করার সুবিধা পাবেন।
ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা: বাজারের দৈনিক তীব্র ওঠানামার মধ্যেও একই দিনে পজিশন ম্যানেজ বা নেটিং করার সুযোগ থাকায় আপনার সুইং ট্রেডের ঝুঁকি কমে আসবে।

গত ৫-৭ বছর ধরে এই কোর এন্ড সেটেলাইট স্ট্রেটেজি ফলো করে আলহামদুলিল্লাহ সন্তোষ জনক রেজাল্ট পেয়েছি। বাজারের ট্রেডিং সাইকেলে আসতে যাওয়া নতুন পরিবর্তন গুল এই স্টেটেজিকে আরো বেশি কার্যকর করবে বলেই ধারণা করছি। 

রবিবার, ২৮ জুন, ২০২৬

স্কয়ার ফার্মা কেন বেশি ডিভিডেন্ড না দিয়ে রিজার্ভ বড় করছে?


স্কয়ার ফার্মা ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে মুনাফা করেছে প্রায় ২৩৯৬ কোটি টাকা! এর মধ্যে BMRE এবং জমি কেনা বাবদ ৬৫০ কোটি টাকা খরচ করবে। ১০৫৪ কোটি ডিভিডেন্ড দিয়ে ক্যাশ আউট করবে। বাকি ৬৯২ কোটি টাকা রিজার্ভ ফান্ডে যাবে।
গত ৫-১০ বছর ধরে এভাবেই স্কয়ার রিজার্ভ বিন্ডাপ করছে। আমার ব্যাক্তিগত ধারণা এটা বড় কিছুর জন্য পুর্ব প্রস্তুতি। কারণ আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বাংলাদেশ LDC থেকে গ্রেজুয়েট হবে। তখন বাংলাদেশের ঔষধ কোম্পানি গুলা আর রয়ালিটি ফি ছাড়া পেটেন্টেড ড্রাগস উতপাদন করতে পারবে না।
সাধারণত নতুন আবিষ্কৃত ঔষধ ১২ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত পেটেন্ট করা থাকে। এই সময় এক মাত্র আবিষ্কারক ঔষধ কোম্পানি সেই ঔষধ সারা দুনিয়ায় বিক্রি করতে পারে। অথবা তার কাছ থেকে লাইসেন্স নিয়ে রয়ালিটি ফি দিয়ে অন্য কোন কোম্পানি তা উতপাদন করতে পারে। যেমন বাংলাদেশে ডায়বেটিক পেশেন্টদের ব্যবহৃত ইন্সুলিন পেটেন্টেড ড্রাগস। এলডিসিতে থাকায় আমাদের কোম্পানি গুল রয়ালিটি দেয়া ছাড়াই ইন্সুলিন উতপাদন করতে পারত। কিন্তু এলডিসি গ্রেজুয়েট হয়ে গেলে ঐ ইন্সলিনের নতুন ভেরিয়েন্টের দাম পড়বে বর্তমান দামের ৩/৪ গুন বেশি। কিছু কিছুর দাম ১০ গুন পর্যন্ত হবে। কেন্সার চিকিৎসার ঔষধ গুলার ক্ষেত্রে ও একই অবস্থা হবে।
অর্থাৎ আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দেশের ১০-১৫% ঔষধের দাম কয়েকগুল বেরে যবে শুধুমাত্র পেটেন্ট ফি ইম্পোজ হওয়ার কারনে। ঐ ঔষধ গুল তখন হয় বিদেশ থেকে কিনে এনে দেশে বিক্রি করতে হবে। অথবা লাইসেন্স নিয়ে দেশেই বানাতে হবে। ডিস্ট্রিবিউটর হিসেবে আপনি বিদেশ থেকে কিনে আনেন অথবা দেশে লাইসেন্স নিয়ে বানান উভয় ক্ষেত্রেই আপনাকে এক কালিন মোটা টাকা খরচ করে ডিস্ট্রিবিউশন লাইন্সেন্স অথবা ম্যানুফেকচারিং লাইসেন্স নিতে হবে।
স্কয়ারের যেহেতু ইউএস এফডিয়ে লাইসেন্স রয়েছে সেহেতু আমেরিকার স্টেন্ডার্ডে ঔষধ বানানোর টেকনোলজি, ম্যানপাওর এবং স্কিল তার আছে। পেটেন্টেড ড্রাগস যা দেশে অনেক চাহিদা সেগুলর জন্য ম্যানুফেকচারিং লাইসেন্স নিবে কোম্পানির গুল। আর যেগুলর চাহিদা অল্প সেগুলো হয়তো সরাসরি ইম্পোর্ট হবে।
এখন বিদেশি বহুজাতিক ঔষধ কোম্পানি গুলা বাংলাদেশে সেন্টাল ফার্মা কিংবা সিলকো ফার্মাকে এই ম্যানুফেকচারিং লাইসেন্স দিবে না। এমনকি আমদানি করার জন্য ডিস্ট্রিবিউশন লাইসেন্স ও দিবে বলে মনে হয় না। লাইসেন্স গুল যাবে দেশের শক্তিশালী ঔষধ কোম্পানি গুলোর কাছে। আমার ধারণা এখানে একটা মনোপলি তৈরি হবে। বিশেষ বিশেষ ঔষধ দেশে আমদানি কিংবা তৈরি করার লাইসেন্স হয়তো একটা মাত্র কোম্পানির কাছেই থাকবে। যে কোম্পানির কাছে ম্যানুফেকচারিং লাইসেন্স থাকবে সে ঐ ঔষধ বানিয়ে মূল নামেই সারা দুনিয়ায় বিক্রি করতে পারবে। আর বলাই বাহুল্য ঐ একই ঔষধ মূল মালিক কোম্পানি ইউরোপ আমেরিকায় বানাতে যে খরচ করবে বাংলাদেশে তার উতপাদন খরচ কম হবে। ফলে দেশ থেকে ঐ ঔষধ মূল নামেই (জেনেরিক নামে না) বিদেশে রফতানি হওয়ার ভাল সুযোগ তৈরি হবে।
একই ভাবে উচ্চ রয়ালিটির কারণে ঔষধের দাম কমানোর একটা চেষ্টা হবেই। যার প্রধান উপায় হল দেশেই নতুন ঔষধ আবিষ্কার করা। পেটেন্টেড ড্রাগস হওয়ায় আবিষ্কারক কোম্পানি নিজের ইচ্ছা স্বাধীন দামে ঔষধ এক চেটিয়া ভাবে ১২ থেকে ২০ বছর বিক্রি করার সুযোগ পাবে দেশে-বিদেশে যদি নতুন কোন ঔষধ আবিষ্কার সম্ভব হয়। ফলে এই সুযোগটা নেয়ার জন্য রিসার্চ এ প্রচুর পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ হবে। আর এই দৌড়ে এগিয়ে থাকবে স্কয়ারের মত ক্যাশ রিচ কোম্পানিগুল!!
দেশে এক চেটিয়া ব্যবসার সুযোগ এবং বিদেশি রফতানির সম্ভাবনা ঔষধ কোম্পানি গুলোর মুনাফা বৃদ্ধির দারুণ সুযোগ নিয়ে আসবে নিকট ভবিষ্যতে। আমার ব্যাক্তিগত ধারণা স্কয়ার ফার্মা গত এক যুগ ধরে সেই সুযোগটা সদ ব্যবহার করার প্রস্তুতিই নিয়েছে।