বিষয় সন্ধান

আজ-কাল লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
আজ-কাল লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বৃহস্পতিবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৫

অক্টোবর ফেনোমেনা : টালমাটাল পুঁজিবাজার

স্টক ভ্যালুয়েশন নিয়ে লেখা লেখির উদ্দেশ্য মূলত সচেতনতা তৈরি করা। মার্কেট যত পড়ছে আমরা তত অধৈর্য হচ্ছি। মার্কেট মেকাররা জানে টেকনিক্যাল চার্টে যত বেশি সাপোর্ট তারা ভাংতে পারবে পাব্লিক তত বেশি প্যানিক হবে, ঈদের আনন্দ নিয়ে তারা বসিয়ে বসিয়ে ডিস্কাউন্ট শপিং করতে পারবে।
 
তাই আপনি যদি হোল্ডিং স্টক নিয়ে কনফিডেন্ট হন, অন্তর্নিহিত মূল্য জানেন তাহলে আর যাই হোক পানির দামে শেয়ার হাত ছাড়া করবেন না। উল্ট সুযোগ কাজে লাগাবেন। মার্কেট মেকাররা ডিস্কাউন্ট শপিং এ কোটি টাকা খরচ করলে আপনি হাজার টাকা খরচ করুন। ইন্ডেক্স পড়লে আমাদের পোর্টফলিও যেমন লাল হয়, তাদের পোর্টফলিও ও লাল। ছোট, মাঝারি, বড় কারো পুজিই আন-লিমিটেড নয়। ঈগল যত উচুতেই উঠুক এক সময় মাটিতে নামে বিশ্রাম নেয়ার জন্য। বিশ্রাম শেষে আবার উড়াল দেয়।

গত দশ বছরে অক্টোবর মাসে বাজার ভাল গিয়েছে এমন নজীর মাত্র একটি। সুতরাং বুঝাই যাচ্ছে এই সময়ে বাজার টালমাটাল অবস্থায় যাওয়ার যৌক্তিক কারণ আছে। এই সময় ডিসেম্বর ক্লোজিং কোম্পানি গুলোর ৩য় প্রান্তিক আর জুন ক্লোজিং কোম্পানি গুলোর ডিভিডেন্ড, রেকর্ড ডেট এবং ১ম প্রান্তিকের ডিক্লারেশন আসায় মার্কেট অনেক বেশি ফ্লাকচ্যুয়েট করে। পরীক্ষায় টেনেটুনে পাশ করা ছাত্রদের রেজাল্ট ঘোষণার আগের রাতের টেনশন ভর করে বাংলা বাজারের বিনিয়োগকারীদের মনে। কারন আর কিছুই না, এখানে জাংকা আর অর্ডিনারী কোম্পানির ছাড়া ছড়ি। বছরের শেষ প্রান্তিকে আয় কেমন আসবে, ডিভিডেন্ড কেমন দিবে সেই অনিশ্চয়তায় ভোগে সিংহভাগ বিনিয়োগকারী। মার্কেট মেকার গন এই সুযোগটাই নেয় প্রতি বছর।
 
মরার উপর খরার ঘা হয় দেশের টেক্স পলিসি। এই বাজারে ৪৯,৯৯,৯৯৯ টাকা ক্যাপিটাল গেইন করলে টেক্স দিতে হয় না। কিন্তু ১ টা ডিভিডেন্ড ইনকাম হলে নুন্যতম ১০% থেকে ৩০% পর্যন্ত টেক্স দিতে হয়। ফলে বড় বিনিয়োগকারীরা এখন আর ডিভিডেন্ড ক্লেইম করতে চায় না। ডিভিডেন্ড ডিক্লারের আগে আগে সেল দিয়ে ক্যাপিটাল গেইন বুক করে চুপচাপ বসে থাকে। ডিভিডেন্ড ডিক্লারেশন, ১ম কোয়ার্টার এবং রেকর্ড ডেটের এডজাস্টমেন্ট শেষে আবার তারা ছেড়ে দেয়া শেয়ার গুল কিনে নেয়। এই সমস্যার একটা যৌক্তিক সমাধান হতে পারে ১০-২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ডিভিডেন্ড ইনকাম টেক্স ফ্রি করে দেয়া। যাতে বড় বিনিয়োগকারীরা লং-টার্ম শেয়ার হোল্ড করতে উৎসাহিত হয়। নিয়ন্ত্রক সংস্থা, সরকার বলে পুজিবাজারে লং-টার্ম বিনিয়োগ করুন। কিন্তু সুযোগ সুবিধা, টেক্স পলিসি, নিয়ম কানুন এমন বানায় যাতে ট্রেডিং আর সর্ট-টার্ম হোল্ডিং উৎসাহিত হয়!!
 
এই সিজনাল ফেনোমেনা গুল যদি আপনি জানেন আর নিজের হোল্ডিং স্টকের ফেয়ার ভ্যালু জানেন তাহলে অহেতুক প্যানিক হবেন না। ব্রড ইন্ডেক্স ইতিমধ্যেই টপ (৫৬৬০) থেকে ১০% পড়েছে আর হাজার পয়েন্টের রেলির (৪৬০০ টু৫৬৬০) ৫০% রিট্রেসমেন্ট করে ফেলেছে। ৩৮%, ৫০%,৬১% আমাদের বাজারের খুব কমন রিট্রেসমেন্ট লেভেল যেখান থেকে বাজার বেক করেছে অতীতে।

হাতে ক্যাশ থাকলে কিনুন। যাচাই-বাছাই করে বস্তা ভরে কিনুন। কারণ বড় ডিস্কাউন্টে বড় লোড না নিয়ে খুচড়া কেনাকাটায় বড় মুনাফার সম্ভবনা হাত ছাড়া হয়ে যায়। বঙ্গ বাজারের কনটেক্সটে ছবির বাংলা অনুবাদ কী হতে পারে?

কিনুন জখন মতিঝিলে ডিএসইআর পূরণ ভবনের সামনে আন্দোলন হয় !!



বৃহস্পতিবার, ২০ জানুয়ারি, ২০২২

বেক্সিমকো সুকুক বন্ডঃ ভয় বনাম সম্ভবনা

অতি সমপ্রতি পুঁজি বাজারের বহুল আলোচিত ৩০০০ কোটি মূল্য মানের বেক্সিমকো সুকুক বন্ডের লেনদেন শুরু হয়েছে। বন্ড আমাদের বাজারে চালু হওয়া নতুন একটি বিনিয়োগ পণ্য । সুতরাং এটি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ধারনা কম থাকবে - এমনটা অস্বাভাবিক কিছু না ।


একে নতুন ইন্সট্রুমেন্ট তার উপর বেক্সিমকোর অতীত কর্মকান্ডে শুরুতেই এই বন্ড পাবলিকের মনোযোগ আকর্ষণে ব্যার্থ হয়েছে আইপিওতে। সেকেন্ডারি মার্কেট ডেব্যু ও খুব একটা সুখকর নয় । লেনদেন শুরুর মাত্র তৃতীয় দিনেই ১০০ টাকা মূল্য মানের সুকুক ৯১ টাকায় নেমে এসেছে । আমার ব্যাক্তিগত ধারনা এই অস্বাভাবিক অবস্থার জন্য যতটা না দায়ী বন্ড/সুকুক নিয়ে পর্যাপ্ত জানাশুনার অভাব , তার চাইতে বেশী দায়ী পুঁজি বাজারে বেক্সিমকো গ্রুপের ইমেজ সংকট। মার্কেট থেকে বেক্সিমকো সিনথেটিকের সেচ্ছায় ডিলিস্ট হওয়ার ঘোষণা দেয়ার দেড় বছর পরেও বিনিয়োগকারীদের টাকা ফেরত না পাওয়া  এবং তার আগে বেক্সিমকোর মালিকানাধীন জিএমজি এয়ালাইন্সের প্লেসমেন্ট শেয়ারের টাকা ফেরত না পাওয়া অন্যতম ইস্যু।

অতীতের এসব তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ধারনা হয়েছে যে সালমান এফ রহমান সাহেবের বেক্সিমকো শেষ পর্যন্ত
সুকুকের মূল টাকা ফেরত দিবে না। তাদের  এমন নেতিবাচক চিন্তার জন্য দোষ দেয়ার ও উপায় নাই। কারন বেক্সিমকোর অতীত কর্মকাণ্ড এই ধারণা তৈরি করেছে। সুতরাং ভাল কিছু করে বেক্সিমকোকেই তাদের ইমেজ ঠিক করতে উদ্যোগী হতে হবে। 

 

 
 
পাব্লিক পারসেপশন থেকে এবার আসি সুকুকের আইনগন দিকে, এই ইসলামিক বন্ড ( যা সুকুক নামে পরিচিত)  হল একটা এসেট ব্যাকড, সিকিউর্ড বন্ড।  বাজারে প্রচলিত অন্যন্য কর্পোরেট বন্ড যেমন ব্যাংক কর্তিক ইস্যুকৃত পার্পিচ্যুয়াল বন্ডগুল আন-সিকিউর্ড এবং নন-এসেট ব্যাকড। অর্থাৎ সুকুক বন্ড থেকে মুনাফা এবং বিনিয়োগকৃত মূল পুজি ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা আন-সিকিউর্ড এবং নন-এসেট ব্যাকড বন্ডের তুলনায় বেশী রয়েছে। এই কারণে সুকুকের টাকায় কেনা সকল স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ বেক্সিমকোর নামে রেজিস্ট্রি না করে সুকুক পরিচালনাকারী সংস্থার (এসপিভি) নামে রেজিস্ট্রি করা হয়েছে। ৫ বছর মেয়াদে ১০ কিস্তির মুনাফা অথবা মেয়াদ শেষে মূল পুজি ফেরত দিতে অক্ষম হলে ট্রাস্টি সুকুকের টাকায় কেনা  সম্পদ বিক্রি করে (এসেট লিকুইডেশন) সুকুক হোল্ডারদের টাকা ফেরত দেবে। লিকুইডেশোনে যেতে মামলা-মোকদ্দমায় যাওয়ার প্রয়োজন হবে না,   শুধু মাত্র বিএসইসির অনুমতি নিয়ে লিকুইডেশন প্রসেস শুরু করা যাবে।

অর্থাৎ আইনগত ভাবে বিনিয়োকৃত অর্থ ফিরে পাবার ক্ষেত্রে কোম্পানির শেয়ার অথবা মিচ্যুয়াল ফান্ড ইউনিট থেকে সুকুক তুলনামূলক নিরাপদ। লস হয়েছে এই কথা বলে বিনিয়োগকারীদের ডিভিডেন্ড না দিয়ে কোম্পানি বা মিচ্যুয়াল ফান্ড বছরের পর বছর পার করে দিতে পারে। কিন্তু সুকুকের ক্ষেত্রে এমন কিছু হলে সোজা এসেট লিকুইডেট হয়ে যাবে। তাছাড়া এই সুকুক বন্ডের রয়েছে বেক্সিমকোর শেয়ারে কনভার্ট হওয়ার অপশন। এই কনভার্শন বিষয়টা ঐচ্ছিক। সুকুক হোল্ডাররা চাইলে বন্ডটি বেক্সিমকর  শেয়ারে কনভার্ট হবে আর না চাইলে হবে না। অতএব কেউ যদি সুকুকের মেয়াদ শেষে মূল পুঁজি ১০০ টাকা ফেরত পাবার ব্যাপারে সন্দিহান থাকেন, তিনি প্রতি বছর ২০ শতাংশ হারে সুকুক বন্ড শেয়ারে কনভার্ট করে আর্লি এক্সিট নিতে পারবেন। 

সুকুক আইন মেনে বেক্সিমকো সময় মত মূল টাকা ফেরত দিবে, সুকুকের টাকায় তৈরি সোলার পার্ক ব্যবসায়ীক ভাবে লাভজনক হবে - এই সবই কাগজপত্র অনুযায়ী সম্ভব। তবে পাব্লিক পার্সেপশন দ্রুত বদলাবে কি না তা বলা মুশকিল। তাই যারা সুকুকে বিনিয়োগ করবেন তাদেরকে জেনে বুঝে রিস্ক নিতে হবে। ব্যবসা করতে গেলে লাভ-লসের রিস্ক থাকবেই। ব্যবসায় তাই অন্ধের মত না জেনে-বুঝে রিস্ক নেয়ার চাইতে ক্যালকুলেটিভ রিস্ক নেয়াই যৌক্তিক।

আমার ব্যাক্তিগত ক্যাল্কুলেশন হল বছরে ১৫% মুনাফার এই সুকুক থেকে করা সম্ভব হবে। এর মধ্যে ১১-১২% আসবে বন্ডের কুপন থেকে । বাকি ৩-৪% সুকুক বন্ড সেক্সিমকোর শেয়ারে কনভার্ট জনিত ক্যাপিটাল গেইন থেকে।  অর্থাৎ ৫ বছরে ১০০ টাকার পুজি আরো ১০০ টাকার মুনাফা জেনারেট করার ভাল সম্ভবনা আছে। আইনগত ভাবে মেয়াদ শেষে মূল পুজি ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা ও আছে। সুতরাং ৫ বছরে পুজি দ্বিগুণ করার জন্য বেক্সিমকো সুকুক বন্ডে বিনিয়োগ করার রিস্ক নেয়া যায়। বিনিয়োগ সুরক্ষায় এসেট ব্যাকড, সিকিউর্ড এবং কনভার্টিবল অপশন থাকার পড়েও যারা এই সুকুকে আস্থা পাচ্ছেন না তারা আপাতত পর্যবেক্ষণে থাকুন। ১-২ বছর নিয়মিত ভাবে কুপন/মুনফা  দেয়া শুরু করলে হয়তো অনেকের বিশ্বাস তৈরি হবে।

বুধবার, ১০ জুন, ২০২০

পুজিবাজারে বাই ব্যাক আইন ও প্রাসংগিক ভাবনা

পুজি বাজারের বহুল প্রত্যাশিত বাই ব্যাক আইন তৈরি করার কথা জানিয়েছে বিএসইসির একটি সূত্র। এই খবরে বাজারের সবার মত আমিও খুশি।  কিন্তু সবাই যে কারণে খুশি, আমার খুশির কারণ তার চাইতে কিছুটা ভিন্ন।

 সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ধারণা হল বাই ব্যাক আইন হলে তাদের পুজির নিরাপত্তা বাড়বে। কোন কোম্পানি আর ফেসভ্যালুর নিচে যাবে না। যদি কোন স্টেক্ত দাম ফেস ভ্যালুর নিচে নেমে যার তবে কোম্পানিটির পরিচালকগণ সাধারন বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে সেই শেয়ার কিনে নিবে। তাদের এই ধারণা আংশিক সত্য, পুরোপুরি নয়। বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত বাই ব্যাক আইন সাধারন বিনিয়োগকারীদের উপকারে আসবে যদি কোম্পানির পরিচালকগন চায়। কিন্তু এই আইন হলেই সবার পুজি নিরাপদ হয়ে যাবে তা না।

আমাদের বাজারে যে সব কোম্পানি এখন ফেস ভ্যালুর নিচে তাদের অধিকাংশের উতপাদন বন্ধ, কোন আয় নেই, ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল নেই, ব্যাংকে জমানো নগদ কাটাও নেই। সুতরাং এসকল কোম্পানিকে বাই-ব্যাক করতে বলা আর শেয়ার হোল্ডারদের সাথে তামাশা করা একই কথা। কারণ শেয়ার বাই ব্যাক করার জন্য যে টাকা দরকার তা কোম্পানির কাছে নাই। টাকা থাকলে কোম্পানির উতপাদন বন্ধ হত না, ব্যাংক ঋণ ও ডিফল্টটেড  হত না। পুজিবাজারে লিস্টেড প্রতিটা কোম্পানি পাব্লিক লিমিটেড কোম্পানি। অর্থাৎ এগুল সীমিত দায়বদ্ধ প্রতিষ্ঠান। কোম্পানির দায় মেটাতে তার শেয়ার হোল্ডার বা পরিচালকগন তাদের ব্যক্তিগত অন্য সম্পদ ব্যবহার করতে বাদ্ধ নন। কোম্পানি ঋন খেলাপি হলে অথবা শেয়ার বাই ব্যাক করতে হলে তার জন্য কোম্পানির সম্পদ খরচ করতে পারবে। মালিকরা তার ব্যাক্তিগত সম্পদ/পুজি বিক্রি করে ঋন ফেরত দিবে না অথবা শেয়ার বাই ব্যাক করবে না। তাই ইউনাইটেড এয়ার, কেয়া কসমেটিক্স, আরএন স্পিনিং, এমারেন্ড অয়েল মার্কা কোম্পানির পরিচালকরা তাদের ব্যাক্তিগত বাড়ি, গাড়ি বেচে শেয়ার বাই ব্যাক করবে এমন ধারনার কোন বাস্তব ভিত্তি নাই।

তাহলে বাই ব্যাক আইনের কোন সুফল কি সাধারন বিনিয়োগকারী পাবে না? জি কিছু সুবিধা আছে যা সাধারণত বিনিয়োগকারীর পক্ষে যাবে। যেমন -

  • এই আইন হওয়ার পর বিএসইসি চাইলে নতুন আইপিও, রাইট ইস্যু, এমাল্গেমেশন করতে চাওয়া কোম্পানি গুলাকে শেয়ার বাই ব্যাক করার শর্ত দিয়ে প্রস্তাব পাশ করবে। আইপিও, রাইট ইস্যু করার ৩/৬/১২ মাসের মধ্যে বাজার মুল্য নির্দিষ্ট লেভেলের নিচে নেমে গেলে কোম্পানিকে শেয়ার বাই ব্যাক করতে হবে। এর ফলে আইপিও, রাইটে অস্বাভাবিক প্রিমিয়াম দাবী করা হ্রাস পাবে।
  • যে সকল কোম্পানির বিশাল ক্যাশ রিজার্ভ/এফডিয়ার আছে কিন্তু তা খরচ করে আয় বাড়ানোর কোন সুযোগ কোম্পানি  পাচ্ছে না,  তারা সেই টাকায় পুজিবাজার থেকে তাদের নিজেদের শেয়ার বাই ব্যাক করে নিতে পারে। এতো কোম্পানির  নেট প্রফিট একই রকম থাকলেও মোট শেয়ার সংখ্যা বা পেইড আপ ক্যাপিটাল  কমে যাওয়ায় পরের বছর কোম্পানির ইপিএস, এনেভি বেড়ে যাবে। তাতে কোম্পানির সকল বিনিয়োগকারী লাভবান হবেন ।  
  • বাজারে অস্বাভাবিক পতন হলে অন্যান্য কোম্পানির সাথে ভাল কোম্পানিগুল দাম হারায় । এখন বাজারে এই ফ্লোর প্রাইস একটিভেট থাকার পড়েও মার্কেট বায়ার লেস কিন্তু কিচ্ছু কোম্পানি আছে যারা এই দামে আন্ডার ভ্যালুড। অথচ নিজেদের লস হবে এই বিবেচনা করে কোন পরিচালক নিজের কোম্পানির শেয়ার কেনার ঘোষণা দিচ্ছে না। অথচ তারা জানে তাদের স্টক আন্ডার ভ্যালুড। বাই ব্যাক আইন থাকলে এই অবস্থায় কোম্পানির পরিচালকরা ক্যাশ ডিভিডেন্ড না দিয়ে অথবা কম দিয়ে সেই টাকায় পাব্লিক মার্কেট থেকে শেয়ার কিনতে পারবে। এতে এক দিকে মার্কেট সাপোর্ট পাবে, তাদের শেয়ার বাউন্সবেক করবে, বিনিয়োগকারীরা উপকৃত হবে। পাশাপাশি শেয়ার সংখ্যা কমে যাওয়ায় তাদের ইপিএস, এনেভি বেড়ে যাবে। ফলে পরের বছর তারা আরো ভাল ডিভিডেন্ড দিতে পারবে।

মূলত এই বাই ব্যাক আইনের বড় সুবিধা পাবে ভাল লাভজনক কোম্পানির পরিচালক ও তাদের লং-টার্ম ইনভেস্টরগন। মার্কেট কারেকশনে পড়ে তাদের শেয়ার বড় ধরনের মূল্য পতন হলে তারা কোম্পানির শেয়ার খোলা বাজার থেকে কিনে নিয়ে নিজেদের শেয়ারকে সাপোর্ট দিতে পারবে এবং মার্কেট কারেকশনকে কাজে লাগিয়ে তাদের সম্পদ মূল্য ও ভবিষ্যৎ আয় বাড়াতে পড়বে। তাই এই বাই ব্যাক আইন বাজারের ফান্ডামেন্টালি স্ট্রিং, ক্যাশ রিচ কোম্পানিগুলোর মালিক পক্ষ ও তাদের লং-টার্ম ইনভেস্টরদের জন্য মুনাফা বাড়ানোর নতুন সুবিধা নিয়ে আসবে। বিএসইসির এই উদ্যোগ সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য । 

শনিবার, ৯ জুন, ২০১৮

বাজেট ২০০১৮-১৯: বিনিয়োগকারীদের যোগ-বিয়োগের খাতায় শূন্য




প্রতি বছরের ন্যায় এই বছর ও পুজিবাজার সংশ্লিষ্ট সবাই আগ্রহ নিয়ে নতুন বাজেট পর্যালোচনা করছেন; পাওয়া না পাওয়ার হিসাব মেলাচ্ছেন। অর্থমন্ত্রীর প্রেজেন্টেশন দেখে এবং প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার বিভিন্ন রিপোর্ট পড়ে আমার ধারনা হয়েছে - এবারের বাজেট পুঁজি বাজারের জন্য খুবই গতানুগতিক। বিশেষ কিছু পাওয়ার আনন্দে আত্নহারা অথবা না পাওয়ার বেদনায় নীল হবার মত কিছু এবারের বাজেটে অনুপস্থিত।

এবারের বাজেট থেকে পুজিবাজারের বড় প্রাপ্তি ব্যাংক,ফাইনান্স,ইনস্যুরেন্স ও জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর ২.৫% টেক্স রেয়াত। যা অর্থ সংকটে আক্রান্ত আর্থিক খাতের কোম্পানিরগুলোকে কিছুটা হলেও সস্তি দেবে। তবে মন্দ ঋণের আড়ালে ব্যাংকগুলো থেকে যে পরিমাণ টাকা লোপাট হয়েছে তার ক্ষত এই ২.৫% মলম দিয়ে সারবে কিনা বলা মুশকিল। মাস দেড়েক পড়ে ব্যাংক-ফাইনাসসের ২য় প্রান্তিক আসলেই প্রকৃত অবস্থা আঁচ করা যাবে। তাই ব্যাংক-ফাইনান্স নিয়ে এখনই উতলা না হয়ে ধীরে চল নীতি নেয়া যেতে পারে। কিছু ব্যাংক-ফাইনান্স যাদের আর্থিক অবস্থা তুলনা মূলক ভাল ও মন্দ ঋণ কম তাদের জন্য এই ছাড় আয় বাড়ানোর উপলক্ষ হবে। এছাড়া ইনস্যুরেন্স ও জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর আয়েও পজেটিভ ইমপ্যাক্ট পড়বে বলে আশা করছি।

আর্থিক খাতের বাইরে ঔষধ ও পোশাক খাতের কোম্পানিগুল কিছু কিছু বিশেষ শ্রেণীর কাঁচা মাল আমদানিতে শুল্ক হ্রাস ও শূন্য শুল্ক সুবিধা পেয়েছে। ফলে তাদের মুনাফাও বাড়বে। তবে এক্ষেত্রে আমি সুবিধা প্রাপ্তি বিবেচনায় পোষক খাতের চাইতে ঔষধ খাতকেই অনেকটা বেশী এগিয়ে রাখব। পাশাপাশি এলএনজি আমদানিকে কেন্দ্র করে শিল্প খাতের গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম আরেক দফা বাড়াবার প্রকৃয়া চলমান। যোগবিয়োগ শেষে কোম্পানিগুলোর ব্যালেন্স শীট কতটা সাস্থবান হবে তা দেখার বিষয়।  

ব্যাক্তি বিনিয়োগকারী হিসেবে এবারের বাজেট থেকে আমাদের সরাসরি কোন প্রাপ্তি নেই। শূন্য কর আয় সীমা আগের মতই ২.৫ লাখ টাকায় স্থির রয়েছে। ডিভিডেন্ড আয়ের উপর শূন্য কর সীমা আগের মতই ২৫ হাজার টাকায় নির্দিষ্ট আছে । আমার বিবেচনায় পুঁজি বাজারের বিনিয়োগকারীদের জন্য এবারের বাজেট হল জিরো-সাম গেম। বাজেট নিয়ে উৎফুল্ল হবার মত বিশেষ কিছু নেই আবার আতঙ্কিত হবার মত ও কিছু নাই।

বুধবার, ১০ আগস্ট, ২০১৬

বই পর্যালোচনাঃ The Zurich Axioms




প্রথমেই আমার শুভাকাঙ্খী জসীম উদ্দিন ভাইকে ধন্যবাদ বইটি পড়ার সুযোগ করে দেয়ার জন্য। The Zurich Axioms বিনিয়োগ কৌশলের উপর লিখিত অনেক পুড়নো একটি বই। বইটিতে বর্ণিত বেশ কিছু নীতির সাথে আমার দ্বিমত থাকলেও কিছু নীতি অনুসরণীয়। বইটির যুম্বক অংশ বঙ্গানুবাদ সহ তুলে ধরলাম। আশা করি আপনারা উপকৃত হবেন।

Designed to lessen risk while increasing rewards, this investment guide outlines the strategies that made the Swiss bankers and businessmen wealthy beyond belief. Gunther provides 12 major Axioms that can help anyone succeed in investing--Swiss style.

'ঝুঁকি হ্রাস করে মুনফা বৃদ্ধির কর্ম-পরিকল্পনা' - যে প্রাচীন কৌশল সুইস ব্যাংকার ও ব্যবসায়ীদের অবিশ্বাস্য রকমের ধনী হতে সহায়তা করেছে তা-ই বর্নিত হয়েছে এই বিনিয়োগ নির্দেশিকায়। ঝুঁকি হ্রাস করে মুনফা বৃদ্ধির এই ১২ টি কৌশল বিনিয়োগকারীদের সফলতার পথ দেখাতে পারে। তবে আসুন দেখি লেখক ম্যাক্স গুন্থার বর্ণীত বিনিয়োগ সফলতার সুইস স্টাইলঃ


On Risk:
- Worry is not a sickness but a sign of health – if you are not worried, you are not risking enough.
- Always play for meaningful stakes – if an amount is so small that its loss won’t make any significant difference, then it isn’t likely to bring any significant gains either.
- Resist the allure of diversification.

ঝুঁকি:

- ভয় অসুস্থতা নয়, সুস্বাস্থ্যের লক্ষণ - যদি আপনি ভয় না পান, তবে আপনি যথেষ্ট ঝুঁকি নিচ্ছেন না।
- সর্বদা অর্থপূর্ণ পরিমানের জন্য খেলুন – পরিমাণ যদি এত ছোট হয় যে তা হারিয়ে গেলে কোনো উল্লেখযোগ্য পার্থক্য হবে না, তাহলে মুনাফা হলেও তা আপনার ভাগ্যের কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনবে না।
- বিনিয়োগে বৈচিত্র আনার মোহ ত্যাগ করুন।

On Greed:
- Always take your profit too soon.
- Decide in advance what gain you want from a venture, and when you get it, get out.

লোভ:
- সর্বদা মুনাফা দ্রুত গ্রহণ করুন।
- ব্যবসার শুরুতেই মুনাফার পরিমাণ নির্ধারন করুন। যখন কাঙ্ক্ষিত লাভ পেয়ে যাবেন, কেটে পড়ুন।

On Hope:
- When the ship starts sinking, don’t pray. Jump.
- Accept small losses cheerfully as a fact of life. Expect to experience several while awaiting a large gain.

প্রত্যাশা:
- জাহাজ ডুবতে আরম্ভ হলে,প্রার্থনা না করে ঝাঁপ দিন।
- জীবনের অংশ হিসেবে আনন্দ চিত্তে ছোট লোকসান স্বীকার করেনিন। একটি বড় মুনাফার অপেক্ষায় থাকা কালে এ ধরনের বেশ কিছু ছোট ক্ষতি মেনেনিন।

On Forecasts:
- Human behaviour cannot be predicted. Distrust anyone who claims to know the future, however dimly.

ভবিষ্যদ্বাণী:
- মানব আচরণ পূর্বানুমান করা অসম্ভব। যে ভবিষ্যৎ দেখতে পায় বলে দাবী করে, ক্ষীণ ভাবে হলেও তাকে অবিশ্বাস করুন।

On Patterns:
- Chaos is not dangerous until it starts to look orderly.
- Beware the historian’s trap – it is based on the age-old but entirely unwarranted belief that the orderly repetition of history allows for accurate forecasting in certain situations.
- Beware the chartist’s illusion – it is characteristic of human minds to perceive links of cause and effect where none exist.
- Beware the gambler’s fallacy – there’s no such thing as “Today’s my lucky day” or “I’m hot tonight”.

ঘটনার পরম্পরা/পুনরাবৃত্তি:
- বিশৃঙ্খলা ততোক্ষণ পর্যন্ত বিপজ্জনক নয় যতক্ষণ পর্যন্ত শৃঙ্খলা ফিরে আসার লক্ষণ স্পষ্ট হয়।
- ইতিহাসবিদের ফাঁদ থেকে সাবধান – এটা খুবই পুড়নো কিন্তু সম্পূর্ণরূপে অন্যায্য বিশ্বাস যে ইতিহাসের সুশৃঙ্খল পুনরাবৃত্তি ঘটে এবং এ থেকে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সঠিক পূর্বাভাস দেয়া সম্ভব।
- চার্টিস্টদের বিভ্রম থেকে সাবধান – এটা মানব মনের বৈশিষ্ট্য যে, আমরা ঘটনার কারণ ও তার প্রভাবের মাঝে যোগসূত্র খুঁজি, এমন কিছুর অস্তিত্ব না থাকলেও।
- জুয়াড়িদের ভ্রান্ত ধারণা থেকে সাবধান - "আজ আমার সৌভাগ্যের দিন" অথবা "আজ আমি ফাটিয়ে দিব" এমন কিছুর অস্তিত্ব বাস্তবে নেই।

On Mobility:
- Avoid putting down roots. They impede motion.
- Do not become trapped in a souring venture because of sentiments like loyalty and nostalgia.
- Never hesitate to abandon a venture if something more attractive comes into view.

গতিশীলতা:
- শিকড় গেড়ে বসা থেকে বিরত থাকুন, এটা আপনার গতি ব্যাহত করবে।
- আনুগত্য এবং অতীত সুখসৃতির কারণে ডুবতে বসা ব্যবসা আগলে রেখনা।
- এক ব্যবসা পরিত্যাগ করে আরো আকর্ষণীয় কোন ব্যবসা শুরু করতে কখনও দ্বিধা করোনা।

On Intuition:
- A hunch can be trusted if it can be explained.
- Never confuse a hunch with a hope.

ইন্দ্রীয় জ্ঞান:
- যদি ষষ্ঠইন্দ্রীয় কিছু পূর্বানুমান করে এবং তা ব্যাখ্যাযোগ্য তবে তা বিশ্বাস করা যায়।
- কখনও আশার সঙ্গে ষষ্ঠইন্দ্রীয়ের পূর্বানুমান গুলিয়ে ফেলোনা।

On the Occult:
- If astrology worked, all astrologers would be rich.
- A superstition need not be exorcised. It can be enjoyed, provided it is kept in its place.

অতিপ্রাকৃত ঘটনা:
- যদি জ্যোতিষশাস্ত্র আসলেই কাজ করত,তবে সব জ্যোতিষী-ই ধনী হয়ে যেত।
- কুসংস্কার লালন করোনা। এটা ততোক্ষণ উপভোগ করা যাবে,যতোক্ষণ তা নিজ স্থানে থাকবে।

On Optimism & Pessimism:
- Optimism means expecting the best, but confidence mean knowing how you will handle the worst. Never make a move if you are merely optimistic.

আশাবাদ ও হতাশা:
- আশাবাদ মানে সেরা কিছুর প্রত্যাশা, কিন্তু আত্নবিশ্বাস হল খারাপ পরিস্থীতি সামলে নেবার দক্ষতা। কিঞ্চিৎ আশাবাদের ভিত্তিতে পা বাড়িয়োনা।

On Consensus:
- Disregard the majority opinion. It is probably wrong.
- Never follow speculative fads. Often, the best time to buy something is when nobody else wants it.

সমঝোতা:
- সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত উপেক্ষা করা সম্ভবত ভুল.
- কখনই ফটকাবাজি ঝোঁক অনুসরণ করোনা। প্রায়শই,কিছু কেনার শ্রেষ্ঠ সময় তখন, যখন অন্য কেউ এটা চায়নয়া।

On Stubbornness:
- If it doesn’t pay off the first time, forget it.
- Never try to save a bad investment by “averaging down”.

একগুঁয়েমি:
- যদি প্রথমেই কিছু মুনাফা দিতে ব্যার্থ হয়,তবে তা ভুলে যান।
- একটি খারাপ বিনিয়োগকে কখনই “গড় ক্রয়মূল্য” কমিয়ে রক্ষা করার চেষ্টা করোনা।

On Planning:
- Long-range plans engender the dangerous belief that the future is under control. It is important never to take your own long-range plans or other people’s seriously. In essence these axioms point to the benefit of having an investment strategy and sticking to it, regardless of what other investors say or do. If you don’t have an investment strategy, you could do worse than adopt these principles. However, don’t be afraid to add or subtract ones according to what works for you.

পরিকল্পনা:
- লম্বা সময়ের পরিকল্পনার একটি বিপজ্জনক দিক হল এটা আসস্থ করে যে ভবিষ্যতে সব নিয়ন্ত্রণে থাকবে। নিজের অথবা অন্যের দূরগামী পরিকল্পনাকে অতি গুরুত্ব দিয়োনা। অন্যরা কী বলছে বা করছে তার চেয়ে লাভজনক হল নিজের বিনিয়োগ পরিকল্পনা সাজানো এবং তাতে অটল থাকা। যদি নিজের কোন বিনিয়োগ পরিকল্পনা না থাকে তবে সমূহ ক্ষতি এড়াতে উপরের নীতিসমূহ অনুসরণ করতে পারেন। ইতিমধ্যেই সফলতা দিচ্ছে এমন কোন নীতি থাকলে এগুলোর সাথে যোগ করতে অথবা সাংঘর্ষিক হলে বাদ দিতে কুণ্ঠিত হবেনা।



শুক্রবার, ২৯ জুলাই, ২০১৬

আর নয় ব্যাংক এক্সপোজারের ভয়

গত ২০শে জুলাই, ২০১৬ বাংলাদেশ ব্যাংক আনুষ্ঠানিক ভাবে ঘোষণা করেছে যে, দেশের ৪৮ ব্যাংক যাদের শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ ছিল তারা প্রত্যেকেই ২০১৩ সালে প্রনীত ব্যাংক-কোম্পানী আইন অনুসারে শেয়ার বাজারে তাদের নিজ নিজ বিনিয়োগ সীমা সমন্বয় করতে সক্ষম হয়েছে। মূলত এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষিত বিশেষ নীতি সহায়তার আওতায় ১৩টি ননকমপ্লায়েন্ট ব্যাংকের অতিরিক্ত বিনিয়োগ আইনি সীমার মধ্যে নামিয়ে আনার মধ্য দিয়ে বিগত তিন বছর ধরে চলে আসা ব্যাংক এক্সপোজার সঙ্কটের অবসান হয়েছে। সংশ্যয়বাদীদের সকল আশঙ্কা ভুল প্রমান করে কোন শেয়ার বিক্রি ছাড়াই আইন মানতে ব্যর্থ হওয়া ব্যাংকগুলোকে যথা সময়ে নিয়ম-নীতির মধ্যে নিয়ে আসা সনভব হয়েছে।

এপ্রিলের শেষ ভাগে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ নীতি সহায়তার প্রস্তাব অনেকেই মেনে নিতে পারেনি। তাঁরা বরং জোড় গলায় আওয়াজ তুলে ছিলেন বিনিয়োগ সমন্বয়ের জন্য নুন্যতম তিন বছর সময় বৃদ্ধি করা হোক। তাঁরা নিশ্চই এখন খুশিতে আত্নহারা। কারণ যা চেয়ে ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংক তার চাইতে বহুগুন বেশি দিয়ে দিয়েছে। তাঁরা ঋণ সমন্বয়ের জন্য সময় চেয়ে ছিলেন অথচ বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের ঋণকে সম্পদে পরিণত করে দিয়েছেন। একদিকে তাঁরা ঋণের বিপরীতে চড়া সুদ গোনার হাত থেকে মুক্তি পেয়েছেন অপর দিকে কেউ কেউ বাজারে নতুন করে বিনিয়োগ করার মত যথেষ্ট পূঁজি হাতে পেয়েছেন।

এক্সপোজার লিমিট নিয়ে সৃষ্ট শঙ্কার সমাধান হওয়ায় পূঁজি বাজারে সুদূর প্রসারী প্রভাব পড়বে। তাৎক্ষনিক ভাবে বাজার সল্প সময়ের মধ্যে বৃহৎ পরিমাণ শেয়ার বিক্রির হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। শেষ সমেয়ে যদি শেয়ার বিক্রি করে এক্সপোজার সমন্বয় করতে হত, তবে এই হটাৎ বিক্রির চাপ সামলাতে না পেরে বাজার মারাত্নক পতনের সম্মুখীন হত। আল্লাহর অশেষ রহমতে তাৎক্ষনিক এই ক্ষতি থেকে রক্ষা পাবার পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্যেও ভাল সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এখন দেখার বিষয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা প্রাপ্ত সুযোগের কতটা সৎব্যবহার করতে পারে।

মার্চেন্ট ব্যাংকগুল তাদের পেরেন্ট কোম্পানি থেকে ঋণ নিয়ে তার একাংশ নিজস্ব পোর্টফলিওতে বিনিয়োগ করাছে। আর বাকি অংশ মার্জিন ঋণ হিসেবে গ্রাহককে দিয়েছে। ২০১০ পরবর্তী মন্দা বাজারে এই ঋণ সমন্বয় করা কষ্ট সাদ্ধ। বিশেষ করে মার্জিন ঋণ হিসেবে বিতরণ করা অর্থ সুদাসল সহ ফেরত পাবার কোন সম্ভবনা নিজট ভবিষ্যতে ছিল না। অধিকাংশ মার্জিন একাউন্টই এখন বাজারে ট্রেড করতে অক্ষম। তাই মার্চেন্ট ব্যাংকগুল একদিকে গ্রাহকের কাছ থেকে কিছুই পাচ্ছিল না অপরদিকে পেরেন্ট কোম্পানিতে সুদ বাবদ তার দায় ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছিল। মার্চেন্ট ব্যাংকগুলর এই ঋণ এখন মূলধনী সম্পদে পরিণত হওয়ায় পেরেন্ট কোম্পনির নিকট থেকে তারা ঋণমুক্ত হয়েছে। ফলে একদিকে সুদ বাবদ তাদের ব্যয় কমে গেছে অপর দিকে মূলধন বৃদ্ধি পাওয়ায়ায় পূঁজি বাজারে তাদের বিনিয়োগ করার জন্য নতুন তহবিল তৈরী হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক হিসেবে ১৩ টি ব্যাংক পনেরশ কোটি এবং ১৩ টি সহ সবগুল ব্যাংক আইনি সীমায় থেকেই প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা নতুন ভাবে শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করতে পারবে।

ব্যাংকগুল শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ বারাবে কিনা তা নিতান্তই তাদের ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত। পূঁজি বাজারে বিনিয়োগ করার কোন বাদ্ধবাদকতা তাদের নেই। তবে বেসরকারী খাতে ঋণ চাহিদা কমে যাওয়ায় তাদের হাতে অলস অর্থের পাহাড় জমেছে। বাজার নিয়ে তারা আস্থাশীল হলে অবশ্যই অলস অর্থেক একটি অংশ আবার বাজারে আসবে। তবে মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর অবস্থা ভিন্ন কারণ পূঁজি বাজার ছাড়া অন্য কোথাও তাদের বিনিয়োগের সুযোগ নেই। তাই যারা মূলধন বৃদ্ধির সুযোগ নিয়েছে তাদেরকে এই পূঁজি আজ হোক কাল হোক শেয়ার বাজারেই বিনিয়োগ করতে হবে। কম মূল্যে বেশী সংখ্যক শেয়ার কিনে, আগেই পোর্টফলিওতে থাকা শেয়ারগুলোর মূল্য সমন্বয়ের এই চমৎকার সুযোগ তারা রোজ রোজ পাবে না। তাই ধীরে হলেও তারা নতুন করে শেয়ার কেনায় মনযোগী হবে।

মার্জিন ঋণধারীরা সরাসরি এক্সপোজার লিমিট সমন্বয়ের কোন সুফল হয়ত পাবেন না। কারণ তাদের ঋণ ও সুদ কোনটাই মাফ হয়নি। তবে যেহেতু মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর উপর চাপ অনেকটা কমেছে সেহেতু তারা কেস টু কেস হিসেবে ভাল গ্রাহকদের সুদ চাইলে মউকুফ করতে পারে। সাধারণ বিনিয়োগকারীগন এক্সপোজার লিমিট সমন্বয়ে দুই ভাবে লাভবান হবেন। ইতিমধ্যেই তাঁরা ব্যাংকের সেল প্রেসারের ভয় থেকে মুক্ত হয়েছেন। সামনের দিনগুলোতে এক্সপোজার লিমিট নিয়ে বাজারে অহেতুক ভীতি সৃষ্টি করার সুযোগ কেউ আর পাবে না। মার্চেন্ট ব্যাংক তথা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা আগের চেয়ে অনেক সস্তি নিয়ে বাজারে নতুন বিনিয়োগ করতে পারবে। তাঁরা বিনিয়োগে মনযোগী হলে স্বাভাবিক ভাবেই শেয়ারের মূল্যস্তর বাড়বে। যার সুফল সরাসরি সাধারণ বিনিয়োগকারীগন পাবেন। অনেক বেশী মুনাফা করা সম্ভব না হলেও তাদের ক্ষতির পরিমাণ কমে আসবে।

সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য আরেকটি সুখবর হল বহুদিন ধরে অবহেলিত ব্যাংক খাতে আবার প্রাণ ফিরে আসার সম্ভবনা তৈরী হয়েছে। ২০১০ এর মহা পতনে সব চেয়ে বেশী ক্ষতির স্বীকার হয়েছে ব্যাংকের বিনিয়োগকারীগন। একদিকে শেয়ারের দাম কমে গেছে অন্য দিকে পূঁজি বাজার থেকে ব্যাংকের আয় কমে যাওয়ায় তাদের ডিভিডেন্ড দেয়ার পরিমাণও কমে গেছে। মার্চেন্ট ব্যংকে দেয়া ঋণ সমন্বয় হওয়ায় তারা আবার পূঁজি বাজারে নতুন করে বিনিয়োগ কারার সক্ষমতা ফিরে পেয়েছে। অপর দিকে মার্চেন্ট ব্যংকে দেয়া ঋণের বিপরীতে বড় অংকের প্রভিশনিং করার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ায় আগামী প্রান্তিক থেকেই অনেক ব্যংকের নিট মুনাফা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে, বিশেষ করে যাদের ঋণ সমন্বয় হয়েছে তাদের।

আর ব্যাংকের আয় বাড়লে তার সুফল সরাসরি ভোগ করবেন শেয়ারধাররীগন। অনেক দিনের লোকসান কমে আসায় আবার তাদের মুখে হাঁসি ফিরে আসবে। বাজারের অন্যতম বৃহৎ খাত ব্যাংক চাঙ্গা হলে পূঁজি বাজারের চেহারা আমূল পাল্টে যাবে। লেনদেন যেমন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে তেমনি বাজার নিয়ে অনাস্থার পরিমাণও কমে আসবে। যা আমাদের পূঁজি বাজারে নতুন প্রাণের সঞ্চার করবে বলেই আমার বিশ্বাস।

মঙ্গলবার, ৫ জুলাই, ২০১৬

২০১৬ঃ ব্যাক্তি বিনিয়োগকারীদের জুন ক্লোজিং



আশা করি ঈদের ছুটি সবাই পরিবার-পরিজন নিজে উপভোগ করছেন। যদিও আনাকাংখিত জঙ্গি হামলার ভায়াবহতায় সবাই শোকাতুর। দুয়ারে চলে আসা ঈদ উৎসব তাই পূর্ণ মাত্রায় আনন্দ দিচ্ছে না।

দেখতে দেখতে ২০১৬ এর ছয়টি মাস পাড় হয়ে গেছে। ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যেই তাদের জুন ক্লোজিং সম্পন্ন করেছে। আর বিনিয়োগকারী হিসেবে আমাদেরও সময় হয়েছে বিগত ছয় মাসের হিসেব মেলানোর। আপনি বিনিয়োগকারী অথবা ট্রেডার যা-ই হোন না কেন নির্দিষ্ট সময় পড় পড় আপনার পোর্টফলিও এবং লাভ-লোকসানের হিসেব মেলান অতীব জরুরী।

DSEX: 4629.64 4507.58 -2.64%
DS30: 1750.59 1770.82 1.16%
DSES: 1107.12 1110.83 0.34%


বিগত ছয় মাসে বাজারের বৃহত সূচক DSEX রিটার্ন দিয়েছে -২.৬৪%। অর্থাৎ এই ইনডেক্সে থাকা ২৩৪টি কোম্পানিতে যদি আপনি বিনিয়োগ করতেন, তবে গত ছয় মাসে আপনার প্রতি ১০০ টাকা মূলধনের বিপরীতে লোকসান হত ২.৬৪ টাকা। একই সময়ে DS30 ও DSES যথাক্রমে রিটার্ন দিয়েছে ১.১৬% ও ০.৩৪%। অর্থাৎ DS30 ইনডেক্সে থাকা ৩০টি এবং DSES ইনডেক্সে থাকা ৭৭টি শক্ত আর্থিক ভিত্তি থাকা (Fundamentally Strong) কোম্পানিতে যদি আপনি বিনিয়োগ করতেন, তবে গত ছয় মাসে প্রতি ১০০ টাকা মূলধনের বিপরীতে আপনার মুনাফা হত যথাক্রমে ১.১৬ ও ০.৩৪ টাকা। আপনার নিশ্চই ইতিমধ্যে বুঝতে পারছেল ভাল ফান্ডামেন্টাল থাকা কোম্পানিতে বিনিয়োগ করার সুফল।

ব্যাক্তি বিনিয়োগকারীদের একটি বিশেষ সুবিধা হল তাদেরকে বহু সংখ্যাক ষ্টক পোর্টফলিওতে ধারন করতে হয় না। আবার কোন একটি স্টকে নির্দিষ্ট পরিমাণ পূঁজি বিনিয়োগের বাধ্যবাদকতা ও থাকে না। তাই মিচুয়াল ফান্ড ম্যানেজার অথবা বাজার সূচকের চাইতে বেশী পরিমাণ মুনাফা করা তাদের জন্য তুলনামূলক ভাবে সহজ।

কিন্তু প্রকৃত চিত্র হল বাজারে খুব অল্প সংখ্যাক সৌভাগ্যবান ব্যাক্তি শ্রেনীর বিনিয়োগকারী আছেন যারা নিয়মিত ভাবে মুনাফা করতে পারেন এবং ফান্ড ম্যানেজার/বাজার সূচককে পরাজিত করতে পাড়েন। এক সমিক্ষায় দেখা গেছে পৃথিবী ব্যাপী মাত্র ১০% ফান্ড ম্যানেজার ১ বছর মেয়াদে বাজার সূচককে পরাজিত করতে পেরেছে। সন্দেহাতীত ভাবেই বলা যায় যে ফান্ড ম্যানেজারগন সকল ক্ষেত্রেই একজন ব্যাক্তি বিনিয়োগকারীর চাইতে বহুগুণ এগিয়ে থাকেন। তাই বাজারকে পরাজিত করা ব্যাক্তি বিনিয়োগকারীরা সংখ্যায় অল্প হবেন এটাই স্বাভাবিক।

ব্যক্তিগত ভাবে দ্বিতীয় প্রান্তিক পর্যন্ত আমার মুনাফার হার খুবই নগণ্য মাত্র ০.৮%। অর্জিত মুনাফা লক্ষমাত্রার ধারে কাছে না থকলেও বাজারের সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় আমি কিঞ্চিৎ সন্তুষ্ট। DSEX ও DSES কে অতিক্রম করা গেলেও DS30 এর কাছে প্রায় দ্বিগুণ ব্যবধানে হেরে গিয়েছি। আশা করছি সামনের দুই প্রান্তিকে এই ব্যবধান কমিয়ে বছর শেষে নিজেকে বিজয়ী বেশেই দেখতে পাব ইনশাল্লাহ।

আপনারাও নিজ নিজ অবস্থা যাচাই করুন। যদি দেখেন আপনার অবস্থান এই তিন সূচকের চেয়ে নিচে তবে বুঝেনিন কোন একটা সমস্যা আছে। আপনার বিনিয়োগ পরিকল্পনা ও পোর্টফলিও সমন্বয় করে সমস্যা সমাধানের চেষ্টায় আত্ননিয়োগ করুন। ঈদ সকলের জীবনে আনন্দ বয়ে আনুক এই শুভ কামনায় শেষ করছি।

শনিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০১৬

ব্যাংক এক্সপোজারঃ একই কুমিরের ছানা আর কতবার দেখব?

এক কুমির দম্পতির সাথে বনের শেয়াল পণ্ডিতের গলায় গলায় ভাব। তাদের এই দহরম-মহরম অবস্থা অন্য পশুরা খুব একটা ভাল চোখে দেখে না। কারন কুচক্রী শেয়ালের লোভের কথা সবারই জানা। অন্যদের সাবধান বাণী শুনেও কুমির দম্পতি শেয়ালের মিষ্টি ব্যাবহারে মজে আছে। কারো কথাই তারা কানে তুলছে না। স্ত্রী কুমির এক দিন তার বাপের বাড়ি যাবে বলে মনস্থির করল। কিন্তু সমস্যা হল তার নয় ছানাপোনা, দূরের পথে যাত্রায় এতগুলকে সে কোন ভাবেই একা সামলাতে পারবে না। শেয়াল অভয় দিল, ‘তুমি বরং এদেরকে আমার ডেরায় রেখে যাও। আমি আর তোমার বর মিলে এদের ঠিক দেখে রাখতে পারব।’

নয় কুমির ছানাকে নিজের ডেরায় পেয়ে শেয়াল পণ্ডিত খুশিতে আটখানা। মউজ-মাস্তিতে তাদের দিন ভালই কাটছে। দিন শেষে পুরুষ কুমির এসে একবার তার বাচ্চাদের দেখে যাচ্ছে। সমস্যা একটাই নাদুস-নুদুস ছানাগুলোকে দেখে শেয়ালের মুখের জল আর বাধ মানছে না। এক দিন নিজেকে সামলাতে না পেরে শেয়াল বাচ্চাগুলোর উপর ঝাপিয়ে পরল। একটি বাদে, বাকি সবগুলোকেই খেয়ে ফেলল। সন্ধ্যায় পুরুষ কুমির তার বাচ্চাদের দেখতে আসল। চতুর শেয়াল কুমিরকে তার গর্তের বাইরে আটকে দিয়ে বলল, ‘কষ্ট করে গর্তে না ঢুকে তুমি বরং এখানেই দাড়াও। আমি এক এক করে সবগুলে দেখাচ্ছি।’ এই বলে শেয়াল একই ছানা গর্তের বাইরে এনে তার বাবাকে দেখাতে লাগল। উল্টে-পাল্টে, চিত-কাত করে একই কুমিরের ছানা নয় বারে নয় ভাবে দেখিয়ে শেয়াল দিন পাড় করতে লাগল।

শেয়ার মার্কেটের ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের অবস্থাও এখন ঐ বাবা কুমিরের মত। গত তিন বছর ধরেই বাজেরের সব ছোট বড় পতনের জন্য দায় চাপানো হচ্ছে ব্যাংক এক্সপোজারের উপর। যেন এই একটি সমস্যার সমাধান হলেই মার্কেট জেগে উঠবে, উর্ধপানে ছুটতে শুরু করবে তেজী ঘোড়ার গতিতে। এই ব্যাংক এক্সপোজার জুজুর ভয় দেখিয়ে বার বার মার্কেটে অস্থিরতা তৈরী করে কম দামে শেয়ার হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে। আবার কিছু দিন পরেই ঐ শেয়ারগুল লাভ সহ বিক্রি করে দেয়া হচ্ছে। ফলে তিন বছর ধরেই বাজার ইনডেক্স ৪০০০-৪৮০০ এই গণ্ডিতে আটকে আছে। আমরা ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীগন বার বার ক্ষতিগ্রস্থ হলেও লাভবান হচ্ছে এক্সপোজার জুজুর ভয় দেখান ইন্সটিটিউশনাল বিনিয়োগকারিরা।

ইনডেক্সের ৪০০০-৪৮০০ গোলক ধাঁদায় পড়ে আমরা ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীগন ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছি কারন আমরা আমাদের মানবিক অনুভূতি তথা ভয় ও লোভকে ঠিক ভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। এক দিকে ইনডেক্স ৪৩০০ এর নিচে নামলেই খারাপ-ভাল সব শেয়ার আমরা পানির দামে ছেড়ে দিচ্ছি। অপর দিকে ইনডেক্স ৪৬০০ ছাড়ালেই সপ্নে বিভোর (৫০০০-৬০০০ ইন্ডেক্সের সপ্ন) হয়ে আমার খারাপ-ভাল বিবেচনা না করে সব রকমের শেয়ার অগ্নিমূল্যে কেনা শুরু করি। আমরা এক বারও চিন্তা করি না, ৪৩০০ ইন্ডেক্সে যে শেয়ার পানির দামে ছেড়ে দিয়েছি ঠিক একই শেয়ার আমরা কেন সোনার দামে কিনছি ৪৬০০ ইন্ডেক্সে। নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করুনঃ
  • ৪২০০-৪৩০০ ইন্ডেক্সে আপনি যখন বিক্রেতা, তখন ক্রেতা কারা? 
  • আবার ৪৬০০-৪৭০০ ইন্ডেক্সে আপনি যখন ক্রেতা, তখন বিক্রেতা কারা?

২০১০ সালের পর থেকে বাজারে নতুন ক্রেতা নেই। ফলে মার্কেটে আমরা ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীগন আর তাঁরা বড় পুঁজির ইন্সটিটিউশনাল বিনিয়োগকারিরা – এই দুই পক্ষই আছি। সুতরাং উঠতি ও পড়তি বাজারে এদের এক পক্ষ ক্রেতা ও অপর পক্ষ বিক্রেতার ভূমিকায় আছে। ২০১০ এর ধসে আমরা ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী ও ইন্সটিটিউশনাল বিনিয়োগকারি উভয়ই সম হারে ক্ষতির স্বীকার হয়েছিলাম। কিন্তু ২০১০ পরবর্তি সময়ে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা ক্রমাগত লোকসান দিয়ে বাজার ছাড়া হচ্ছে আর ইন্সটিটিউশনাল বিনিয়োগকারিরা ছোট ছোট মুনাফা নিয়ে টিকে আছে। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের বড় বড় লস থেকেই যে ইন্সটিটিউশনগুল ছোট ছোট লাভের মুখ দেখছে তা নিশ্চয়ই পাঠকগণ বুঝতে পারছেন।

তাই ব্যাংক এক্সপোজার জুজুর ভয় দেখিয়ে তাঁরা বার বার ফায়দা লুটছে আর আমরা একই ভুল বার বার করে ক্ষতির স্বীকার হচ্ছি। এবার আসুন নিজেদের এক্সপোজার জুজুর ভয় থেকে মুক্ত করি। বাস্তবতা জানি যা কেউ আমাদের খোলসা করে বলছে না। ২০১২ সালে বাংলাদেশ সরকার বেশকিছু শর্ত পালনের বিনিময়ে আইএমএফ এর কাছ থেকে ১ বিলিয়ন ডলার ঋণ লাভ করে। এই শর্তসমুহের অন্যতম ছিল ব্যাংক খাতে সংস্কার সাধন। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৩ সালে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন করা হয়। পূর্বে ব্যাংকগুল যেখানে মোট দায়ের ১০% বিনিয়োগ করতে পারত সেখানে তাকে মোট সম্পদের ২৫% বিনিয়োগের অনুমোদন দেয়া হয়। ফলে শেয়ার বাজারে অন্তর্ভুক্ত বা বহির্ভুত কোম্পানি সমূহে ব্যাংকের বিনিয়োগ সীমা উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে যায়। উদাহরণ সরুপঃ কোন ব্যাংকের মোট মূলধন ৪০০ কোটি এবং মোট দায় ২০০০ কোটি টাকা হলে, ২০০৯ সালের আইনে ব্যাংকটি ২০০ কোটি বিনিয়োগ করতে পারলেও ২০১৩ সালের সংশোধিত আইনে মাত্র ১০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে পারবে। ফলে অতিরিক্ত ১০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ কমিয়া আনতে ব্যাংকগুলকে তিন বছর (২০১৬ সালের ২১ জুলাই) পর্যন্ত সময় দেয়া হয়।

এই অতিরিক্ত বিনিয়োগ আইনসিদ্ধ সীমায় নিয়ে আসার জন্য ব্যাংকগুলোর সামনে দুইটি উপায় খোলা ছিল – (১) পোর্টফলিওতে থাকা শেয়ার বিক্রি করে বিনিয়োগ কমিয়ে আনা। (২) ব্যাংকের সম্পদ বৃদ্ধি করে বিনিয়োগ সীমা বাড়িয়ে নেয়া। দেশের ৫৬টি ব্যাংকের মধ্যে ৪৮টি শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করেছে। ২০১৩ সালে তাদের মোট সম্পদের ৩৫% ভাগ শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগকৃত অবস্থায় ছিল। এই বিনিয়োগ ২৫% আইনি সীমায় নামিয়ে আনতে ব্যাংকগুল দুই ভাবেই চেষ্টা করেছে। এক দিকে তারা পোর্টফলিওতে থাকা শেয়ার বিক্রি করেছে। অন্যদিকে ষ্টক ডিভিডেন্ড, আয় অনুপাতে কম ক্যাশ ডিভিডেন্ড, রাইট শেয়ার ইস্যু ও কর্পোরেট বন্ড ছেড়ে নিজেদের মোট সম্পদ বাড়িয়ে নিয়েছে। ফলে ২০১৫ সালের নভেম্বরে ৪৮ টি ব্যাংকের সম্মিলিত বিনিয়োগ ৩৫% থেকে ২৩% এ নেমে আসে। অর্থাৎ আজ থেকে পাঁচ মাস আগেই ব্যাংক খাত সম্মিলিত ভাবে ২৫% বিনিয়োগ সীমায় নেমে আসে।

কিন্তু গোল বাধিয়েছে ৭/৮টি ব্যাংক তারা আলাদা আলাদা ভাবে নিজেদের বিনিয়োগ ২৫% এর মধ্যে নিয়ে আসতে ব্যর্থ হয়েছে। মূলত এরাই বিগত এক-দেড় বছর ধরে এক্সপোজার লিমিট প্রতিপালনের সময় ২/৩ বছর বাড়াবার জন্য চেষ্টা তদবির করছে। ঐ ৭/৮ টি ব্যাংকের মধ্যে সোনালী, জনতা এদের মত বড় ৩টি সরকারী ব্যাংকও রয়েছে। তাই সরকারের অর্থ বিভাগ, ২/১ জন মন্ত্রী উপদেষ্টা চাইলেও বাংলাদেশ ব্যাংক সময় বৃদ্ধির বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। কারন বাংলাদেশ ব্যাংক বুঝতে পেরেছে যে, সময় বাড়ালেই ৭/৮টি ব্যাংক কমপ্লায়েন্ট হয়ে যাবার শতভাগ সম্ভবনা নেই। আবার সময় বাড়াতে গিয়ে আইন পরিবর্তন ও আইএমএফ এর শর্ত ভংগের ঝামেলায় যেতে হবে। তাই বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সহায়তা দিয়ে তাদেরকে ২১ শে জুলাই ২০১৬ এর মধ্যে তাদেকে আইনি সীমায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক যেহেতু বলছে যে বায়ংকগুলকে তাদের শেয়ার বিক্রি করতে হবে না; সেহেতু নীতি সহায়তার আওতায় এমন কিছু থাকবে যাতে ব্যাংকের মোট সম্পদ হিসাবায়নে পরিবর্তন ঘটবে এবং তাদের মোট সম্পদের পরিমাণ বাড়বে। আশা করি বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার প্রকাশিত হলেই সব কিছু পরিষ্কার হবে।

শেয়ার মার্কেট সংশ্লিষ্ট কতিপয় ব্যাক্তি/সংস্থা ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত ভাবে আমাদের ভুল সপ্ন দেখাচ্ছেন। তারা বলছেন, এক্সপোজার লিমিট প্রতিপালনের সময় ২/৩ বছর বাড়ালেই বাজার স্বাভাবিক হয়ে যাবে। লেনদেল আবার হাজার কোটির ঘরে পৌঁছাবে, ইনডেক্স হবে ৬০০০ -৭০০০। কিন্তু তাঁরা কেউই বাজারের মূল দুই সমস্যা –পূঁজি ও আস্থার সঙ্কট নিয়ে কিছুই বলছেন না। বাজারে নতুন বিনিয়োগ আসছে না। ৪৮ টি ব্যাংকের মধ্যে ৭/৮ টি ননকম্পায়েন্ট ব্যাংক ছাড়া বাকিরা টাকা নিয়ে বসে আছে কিন্তু বিনিয়োগ করছেনা। ঐ ৪০ টি কমপ্লায়েন্ট ব্যাংক চাইলেই আইনের মধ্যে থেকে আগামী দিনে ২/৩ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে পারে। বীমা কোম্পানিগুল ৫/৭ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগযগ্য তহবিল নিয়ে বসে আছে কিন্তু মার্কেটে বিনিয়োগ করছে না। ব্যাক্তি শ্রেণীর বড় বিনিয়োগকারীগন কেউ কেউ হয় মার্জিন ঋণ জালে আটকে আছেন অথবা আস্থাহীনতায় বাজার বিমুখ।

এই বড় তহবিলগুল তখনই বাজারে আসবে যাখন তাঁরা নুন্যতম আস্থা ফিরে পাবে। বড় বিনিয়োগ ডে-ট্রেডিং করার জন্য বাজারে আসে না। এগুল একটি নির্দিষ্ট সময়ের (৩/৫ বছর) জন্য মার্কেটে আসে। মেয়াদ শেষে লাভ সহ বাজার থেকে বের হবার যথেষ্ট নিশ্চয়তা না পেলে ঐ বড় পুজিগুল কখনই মার্কেটে আসবেনা। নিয়মের মধ্যে থাকা ব্যাংক/বীমা কোম্পানিগুল ৫/৭ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে যদি ৩/৪ বছর পর ক্রেতা খুঁজে পাবার ব্যাপারে সন্ধিহান থাকে, তবে তারা কেন বড় পূঁজি নিয়ে মার্কেটে আসবে? তাই ষ্টক এক্সচেঞ্জসমূহ ও বিএসইসির উচিত আস্থা পুনর্নিমানে মনযোগী হওয়া। দেশের নামীদামী কোম্পানিগুলোকে লিস্টিং করারা পাশাপাশি ক্ষুদ্র-মাঝারী ও বড় ব্যাক্তি শ্রেনীর বিনিয়োগকারীদের আবার বাজারমুখী করতে হবে। যথাসাদ্ধ উপায়ে শেয়ার কারসাজী ও দূর্বল কোম্পানির লিস্টিং বন্ধে কাজ করতে হবে। বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থাসমূহের সততা ও যোগ্য প্রচেষ্টার প্রমাণ পেলেই ব্যাক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক উভয় শ্রেনীর বিনিয়োগকারীগণ পুনরায় মার্কেটে ফিয়ে আসবে। সেই শুভ দিনের দেখা আমরা অচিরেই পাব- শুধু এই প্রত্যাশাই করি।




শনিবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০১৬

খেলোয়ারের কাজ খেলায় মনোযোগ দেয়া,স্কোরবোর্ড দেখা দর্শকের কাজ

আমাদের শেয়ার বাজারে আবারো মূল্য পতন ঘটেছে। নতুন বছরে বাজার সূচক ৪৬২৪ পয়েন্ট নিয়ে যাত্রা শুরু করে মাসের শেষ প্রান্তে এসে ৪৫৪০ এ অবস্থান করছে। শুরু আর শেষের ব্যবধান হিসেব করলে ২১ কর্ম দিবসে বাজার সূচক কমেছে মাত্র ৮৪ পয়েন্ট। কিন্তু প্রকৃত চিত্র বেশ খানিকটা ভিন্ন। মাসের প্রথম ১৩ দিনে সূচক ৭০ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে ৪৬৯৪ এ পৌঁছে গেলেও শেষ ৮ দিনের টানা পতনে সূচক কমেছে ১৫৪ পয়েন্ট। ফলে শুরু আর শেষের ব্যবধান মাত্র ৮৪ পয়েন্ট হলেও মাস জুড়ে বাজারে উত্থান-পতনের তীব্রতা অনেক বেশি অনুভূত হয়েছে।

সূচকের এই রোলার কোস্টারের ন্যায় উঠা-নামায় বরাবরের মতই লাভবান হয়েছেন কৌশলী বিনিয়োগকারীগন। আর যারা ৩ থেকে ৭ দিনের ব্যবসায়ী মানে ডে-ট্রেডার তাঁরা শুরুর দিনগুলোতে লাভের মুখ দেখলেও শেষ দিকে এসে চরম মার খেয়েছেন। তাই আমি সব সময়ই মাঝারী থেকে দীর্ঘ মেয়াদি বিনিয়োগে বিশ্বাসী এবং আপনাদেরও হাতে সময় নিয়ে বিনিয়োগের পরামর্শ দেই। আমার সব লেখা এই সব বিনিয়োগকারী ভাই-বোনদের জন্য। আর যারা ডে-ট্রেডিং করেন তাদেরকে কিছু বলার মত যথেষ্ট জ্ঞান আমার নেই, তাদের জন্য শুধু শুভকামনা।

প্রত্যেক বিনিয়োগেই ‘বিনিয়োগ পরিকল্পনা’ একটি গুরুতবপূর্ণ ব্যাপার। আপনি কখন স্টক ক্রয়/বিক্রয় করবেন, কখন লাভ তুলে নিবেন আর কখন শেয়ারটি ধরে রাখবেন –এই সবই আপনার বিনিয়োগ পরিকল্পনার অংশ। সল্প থেকে মধ্য মেয়াদি বিনিয়োগে ( ৬ থেকে ১২ মাস) এই পরিকল্পনা যত সুষ্ঠ ভাবে বাস্তবায়ন করা যায় ৩-৭ দিনের ডে-ট্রেডিং এ পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ততটা সহজ নয়। কারন এত অল্প দিনে বাজার সূচক ও টার্গেটকৃত শেয়ারটি মূল্য কোনটাই যাথাযথ অনুমান করা সম্ভব নয়। ৫-৭ দিনের ছোট্ট ঝড়েই এক জন ডে-ট্রেডার তার ২৫-৫০% পর্যন্ত মূলধন হারিয়ে ফেলতে পাড়েন।

বাজার ৫১ পয়েন্ট সূচক হারালেও জানুয়ারী মাসে অনেকেই ভাল মুনাফা করেছেন। সল্প মূলধনী কয়েকটি জাংক অথবা ছোট মূলধনের (পরিশোধিত মূলধন ১০০ কোটি টাকার কম) ভাল কোম্পানিগুল এই মাসে ২৫-৩৫% মুনাফা দিয়েছে। যারা তুলনামূলক ভাবে রক্ষণশীল বিনিয়োগকারী তথা বড় মূলধনী স্টেবল কোম্পানিতে বিনিয়োগ করেন তারাও এই মাসে ১০-২০% লাভের মুখ দেখেছেন। উদাহরণ স্বরূপ বিদ্যুৎ ও জ্বালানী খাতের এসপিপিসিএল, সামিট পাওয়ার, ইউনাইটেড পাওয়ার ইত্যাদি। তিন-চার মাস আগে (অক্টোবর-নভেম্বর ২০১৫) যারা এই কোম্পানির স্টকগুল কিনেছিলেন সামনের ডিভিডেন্ড মৌসুমকে (মে-জুন ২০১৬) টার্গেট করে তাঁরা বেশ ভাল মুনাফা করেছেন। ৯ মাসে তাঁরা যে মুনাফা টার্গেট করেছিলেন তা চার মাসেই পেয়ে গেছেন।

এসপিপিসিএল [ক্রয়-৫২/৫৩ বিক্রয়-৫৯/৬০ মুনাফা -১৩%]
সামিট পাওয়ার [ক্রয়-৩৩/৩৪ বিক্রয়-৪১/৪২ মুনাফা -১৯%]
ইউনাইটেড পাওয়ার [ক্রয়-১৩৫/১৩৬ বিক্রয়-১৬৪/১৬৫ মুনাফা -২১%]

বর্তমান ডাউন মার্কেট তাদেরকে আবার সুযোগ করে দিয়েছে শেয়ারগুল নিয়ে নতুন বিনিয়োগ পরিকল্পনা সাজাবার। হ্রাসকৃত মূল্যে কেনার সুযোগ এলে নিশ্চিত ভাবেই তাঁরা সুযোগের সদ্ব্যবহার করবেন। জানুয়ারীর শেষ দিকে এসে কোম্পানিগুল তাদের প্রান্তিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা শুরু করেছে। বিনিয়োগকারীদের উচিত এগুল সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ করা।

বিশেষ করে মার্চ-জুন ক্লোজিং কোম্পানিগুলোর ২য়/৩য় প্রান্তিকের আয়ের প্রতিবেদন মনযোগ দিয়ে দেখুন। কে জানে এখান থেকেই আপনি আগামী ৬ মাসের জন্য ভাল একটি বিনিয়োগযোগ্য কোম্পানি পেয়ে যেতে পারেন। কী বিশ্বাস হচ্ছে না, ভাল কোম্পানি পেয়ে যাওয়া কি এতই সোজা? জী জনাব খুবই সহজ। গত ৫ বছর ধরে আমি একটি ঔষধ কোম্পানির ষ্টক হোল্ড করছি। বছর বছর ডিভিডেন্ড নেই। দাম অনেক বেড়ে গেলে বিক্রি করে নগদ লাভ তুলে নেই আবার দাম কমার সুযোগে কিনে নেই। এ মাসে প্রকাশিত কোম্পানিটির আয়ের প্রতিবেদনে গত বছরের চেয়ে ৪০% বেশী আয় রিপোর্ট করা হয়েছে। ফলে ভাল ডিভিডেন্ড আসার পাশাপাশি বাজার মূল্যে বড় পরিবর্তন হয়ার সমূহ সম্ভবনা আছে। অথচ গত ৩/৪ মাস ধরে এর বাজার দর একই স্থানে ঘুরপাক খাচ্ছে। একটু চোখ-কান খোলা রাখলে আপনিও নিশ্চত ভাবে এমন কিছু কোম্পানির খোঁজ পেয়ে যাবেন।

বাজার সূচক শুধু সমগ্র বাজারের একটি খণ্ড চিত্র আপনাকে দেয়, এর বেশী কিছু নয়। ৩৪১ টি স্টকের মধ্যে মাত্র ২৩৪ টি এই সূচকের অন্ত্ররভূক্ত। মানে বাজারের একতৃতীয়াংশ কোম্পানি রয়েছে বাজার সূচক ডিএসইএক্স এর আওতার বাইরে। তাই এটি দেখেই আশান্বিত/হতাশাগ্রস্থ হয়ে কোন কোম্পানির ষ্টক ক্রয়/বিক্রয়ের সিদ্ধান্ত নেয়া যৌক্তিক নয়। মনে রাখবেন আপনি কোম্পানির ষ্টক কিনছেন বাজারের ইনডেক্স নয়। মার্কেট ইনডেক্স আপনাকে সংখ্যাগরিষ্ঠ বিনিয়োগকারীদের মনস্তাত্ত্বিক আবস্থা সম্পর্কে নির্দেশনা দিবে কিন্তু কোন ভাবেই একটি স্টকে এন্ত্রি/এক্সিট সিগন্যাল দিবে না।

তাই বাজার সূচকে চোখ রাখুন কিন্তু কোন ভাবেই এটিকে মূল লক্ষবস্তু বানিয়ে ফেলবেন না। শেষ বিচারে কোম্পানির আয়-রোজগারই তার দাম নির্ধারনের মূল নিয়ামক। তাই বিনিয়োগকৃত কোম্পানির আর্থিক অবস্থাকে টার্গেট করুন বজার সূচককে নয়। বিনিয়োগ গুরু অয়ারেন বাফেটের ভাষায় – ‘খেলোয়ারদের মূল কাজ মাঠের খেলায় মনোযোগ দেয়া, স্কোরবোর্ড দেখা দর্শকের কাজ।’ নিশ্চই বুজতে পারছেন ষ্টক মার্কেটে কোনটি খেলোয়ার আর কোনটি স্কোরবোর্ড।








বৃহস্পতিবার, ১২ নভেম্বর, ২০১৫

মহা পতনের সেই দিনগুলো



২রা আগস্ট থেকে আজ ১২ই নভেম্বর ২০১৫, দিনপঞ্জির হিসেবে খুব বেশী নয় মাত্র ১০৩ দিন। এই অল্প দিনেই দেশের শেয়ার বাজারে রীতিমত সুনামি ঘটে গেছে। ঢাকার বাজারে সূচক পড়েছে ৪২৮ পয়েন্ট কিন্তু বাজার মূলধন কমেছে প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা!  DSEX ইনডেক্স বাজারের করুণ অবস্থা বুঝাতে অক্ষম। শতকরা হিসেবে ইনডেক্স মাত্র ৮.৮ শতাংশ কমলেও সাধারণ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ক্ষতির পরিমাণ অনেক অনেক বেশি। কেউ কেউ তাদের মোট বিনিয়োগের ৩০-৩৫% পর্যন্ত হারিয়াছেন।

ব্যাক্তিগত ভাবে এই মিনি ধসের কোন যৌক্তিক কারণ আছে বলে আমি মনে করি না। বাজারে প্রাথিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী হিসেবে পরিচিত ব্যাংক ও তাদের সাবসিডিয়ারী মার্চেন্ট বাংকগুলো মূলত তাদের দাবী আদায়ের জন্যই এই দুঃসহ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। যাতে বরাবরের মতই জিম্মি করা হয়েছে ক্ষদ্র বিনিয়োগকারীদের। বড় পুঁজির প্রাথিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা  এক ঢিলে দুই পাখি মাড়ার ফন্দি এঁটেছে।  এক দিকে তাদের কাঙ্ক্ষিত এক্সপোজার লিমিট সমন্বয়ের জন্য তাঁরা বর্ধিত সময়ের দাবী আদায় করবে।  অপর দিকে দাবী পূরণ শেষেই বাজার উর্ধ্মুখি হলে সেই লাভও তারা পকেটস্থ করবে। কারণ এই ধসে বড় ক্রেতা-বিক্রেতা উভয় ভূমিকাতেই ছিল ইন্সটিটিউশনাল বিনিয়োগকারীরা। প্রথমে তারা সেল প্রেসার দিয়ে পেনিক তৈরী করেছে। সাধারণ বিনিয়োগকারীগন দিশেহারা হয়ে বিক্রি শুরু করলে তাঁরাই আবার ঐ শেয়ারগুল কম দামে ধীরে ধীরে কিনে নিয়েছে।

খুবই সাধারণ উপায়ে তাঁরা তাদের বিনিয়োগ ঝুঁকি কমিয়ে নিয়েছে। ধরুন ৬০ টাকার ১০০০ ষ্টক আপনি ১০ টাকা লসে সেল দিয়ে ঐ কোম্পানির ১৬৫০ টি ষ্টক  যদি আবার ৩০ টাকায় কিনে নিতে পারেন,  তবে কেমন হয়?  দুই বার ক্রয়-বিক্রয়ের ব্রোকারেক কমিশন গোনায় ধরলেও আপনার নতুন কেনা স্টকগুলোর গড় মূল্য দড়াবে ৩৬ টাকা! কী আশ্চর্য অচ্ছেন? কত সহজে আপনি গড় ক্রয় মূল্য ৬০ টাকা থেকে ৩৬ টাকায় নামিয়ে আনলেন। ঠিক এ কাজটিই করেছে ইন্সটিটিউশনগুল। এবার শুধু এক্সপোজার লিমিটের  দাবী আদায় হলেই ষোলকলা পূর্ণ হবে।

ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী হিসেবে আমাদের প্রধান দুর্বলতা হল তিনটিঃ (ক) বাজারে প্রভাব বিস্তার করার মত বড় পুঁজির অভাব। (খ) প্রাথিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মত জোটবদ্ধ না হতে পারা এবং (গ)  অল্পতেই পেনিকড হয়ে পরা। ফলে শেয়ার বাজারে, কালে-ভদ্রে লাভের মুখ দেখলেও ক্ষতির ভাগীদার সব সময়ই আমরা। যারা এই কৃত্তিম পতনে বিপর্যস্থ তাদের জন্য কিছু পূর্বাভিজ্ঞতা শেয়ার করছি। আশা করি এখান থেকে আপনারা ক্ষতি কাটিয়ে উঠার উপায় খুঁজে পাবেন।  
  
আমি শেয়ার বাজারে আছি ২০০৭ থেকে। সবাই শুধু ২০১০-১১ এর মহা পতনকে মনে রেখেছে কিন্তু ভুলে গেলে ২০০৮ থেকে ২০১০ এর নভেম্বর এই সময় টুকু। মইনুদ্দিন-ফকরুদ্দিন সরকারের ভয়ে দেশের বড় বড় ব্যবসায়ীরা দামী দামী গাড়ি রাস্তায় ফেলে সব পালাল। দেশের ব্যাবসা বাণিজ্য বন্ধ প্রায়। ব্যাবসায়িক মন্দায় পুঁজিপতিরা ব্যবসা ফেলে তাদের টাকা নিয়া আসল শেয়ার বাজারে। ব্যবসায়ীদের ঋণ দিতে না পেরে ব্যাংক গুলোও তাদের বড় পূঁজি নিয়ে বাজারে হাজির। ফলস্বরূপ শুরু হল সূচকের এক টানা উত্থান।

খারাপ
ভাল সব শেয়ারের দামই বাড়তে লাগল। যা কেনে তাতেই লাভ পেয়ে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা তাদের লোভ সামলাতে পারেনি। প্রথমে তাঁরা তাদের সব পূঁজি বিনিয়োগ করল। এর পর ব্যাক্তি পর্যায়ে ধারদেনা করে অথবা জমি-জমা বেঁচে সেই টাকা ও বাজারে নিয়ে এল। সব শেষে মার্চেন্ট ব্যাংকের পাল্লায় পড়ে তাঁরা জীবনের সব চেয়ে বড় ভুল করল উচ্চ সুদে মার্জিন ঋণ নিয়ে। যার ১ লক্ষ টাকা বিনিয়োগ ছিল সে ১৮-২০% সুদে আরও ২ লক্ষ টাকা ঋণ পেল। ফলাফল প্রায় প্রতি মাসেই বাজারে টার্নওভারের রেকর্ড হতে লাগল। ২০০৭ এ যে শেয়ার ২৫-৩০ টাকা ছিল, ২০০৯ এ তা ৬০-৭০ টাকা হয়ে গেল।

বাজার এতটাই বেড়ে ছিল যে, আমার মত মাত্র দুই বছরের নবীন বিনিয়োগকারীও এই সময়ে পুজি দুই গুন করে নিয়েছিল। ২০১০ এর শুরুতে লাভগুল ধীরে ধীরে তুলে নেই কারন বাজার তখন তপ্ত কড়াই। দুই-চার জন বিশেষসজ্ঞ সাবধান বানী উচ্চারন করলেও কে শোনে কার কথা। সব চেয়ে ভাল সিদ্ধান্ত ছিল মার্জিন লোনের ফাদে পা না দেয়া। দূর্বল ও মাঝারী মানের সব ষ্টক নেচে দিয়ে বেছে বেছে বাজারের সব চেয়ে ভাল ফান্ডামেন্টাল স্টকগুলোয় বিনিয়োগ সরিয়ে নিলাম। কিন্তু এত প্রস্তুতির পরেও ডিসেম্বর,২০১০ থেকে ফেব্রুয়ারী,২০১১ এই তিন মাসেই বিনিয়োগের ৫০% নাই হয়ে গেল। যারা মার্জিন ঋণ নিয়েছিল সব চেয়ে বিপদে পড়ল তাঁরাই । এক দিকে শেয়ারের দাম পড়ে গেল অন্য দিকে সুদ বাড়তে লাগল লাগাম ছাড়া। প্রথমেই কিছু লোক ফোর্সড সেলের স্বীকার হয়ে সর্ব শান্ত হল। পড়ে ফোর্সড সেল বন্ধ হলেও উচ্চ সুদ আর নিম্ন শেয়ার মূল্য, সব মিলিয়ে মার্জিন একাউন্টগুল নেগেটিভ ইকুইটি হয়ে চলে গেল মার্চেন্ট ব্যাংকের জিম্মায়। ফল
মার্জিন ঋণধারী প্রায় সবাই ফতুর।

যেহেতু আমার সবটাই নিজের পুঁজি, তাই টাকার প্রয়োজনে কোন শেয়ার বিক্রি করতে হয়নি। আর শেয়ার মার্কেট আমার আয়ের এক মাত্র উৎস নয়। তাই চাকরীর টাকার জীবন ধারন করে যা বেচে যেত সেই ছোট ছোট সঞ্চয় দিয়ে নিজের পোর্টফলিওতে থাকা শেয়ারগুল এভারেজ করতে থাকলাম। আবার বছর বছর দেয়া ষ্টক ডিভিডেন্ডগুলো ও নিতে থাকলাম। ২০১১ এর মার্চ থেকে ২০১৩ এর জুন , মাত্র ২৭ মাসেই সেই হারানো ৫০% পূঁজি বাজার থেকে তুলতে পেরেছিলাম। এই ২৭টি মাস আমাকে অনেক কিছুই শিখিয়েছে, তাই ২০১৪ এবং ২০১৫ এই ২ বছরে বাজারের মন্দা ভাব না কাটলেও আমার মুনাফায় ভাটা পড়েনি। ২০১৪ সালে ১৪% আর এই বছর এখন পর্যন্ত ৬.৮% মুনাফা করেছি। মুনাফার একটাই কারন
আমি ক্যাপিটাল গেইন নয় বরং ভাল কোম্পানিগুলর দেয়া ক্যাশ/স্টক টার্গেট করেছি। খারাপ মার্কেটে যখন ক্যাপিটাল গেইন লাভ করা কষ্টসাধ্য তখন মুনাফার বিকল্প উপায় হল ডিভিডেন্ড।

 
ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য শিক্ষনীয়ঃ


  • শেয়ার বাজার কখনই আপনার আয়ের প্রধান উৎস না। চাকরী-ব্যবসার পাশাপাশি ২য় আয়ের মাধ্যম হল পুঁজি বাজার। 
  • আপনার ছোট ছোট সঞ্চয়গুল ধীরে ধীরে পূঁজি বাজারে বিনিয়োগ করুন। অনেকটা ব্যাংক ডিপিএস এর মত। ৩/৪ মাস পর পর নিয়মিত ভাবে ছোট ছোট এমাউন্ট বাজারে বিনিয়োগ করুন।  
  • শুধুমাত্র নিজের পুঁজি বিনিয়োগ করুন। ঋণের টাকা কখনই শেয়ার বাজারে আনবেন না।  
  • নিয়মিত ডিভিডেন্ড দেয়া ভাল কোম্পানিতে ধীর্ঘ সময় ধরে বিনিয়োগ করুন।  
  • বাজার থেকে ক্যাপিটাল গেইন অর্জন সম্ভব না হলে ডিভিডেন্ড টার্গেট করুন। পতনশীল বাজারে ডিভিডেন্ডই আপনার মুনাফার প্রধান অবলম্বন।