বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) দেশের শেয়ার বাজারে গতিশীলতা বাড়াতে স্ক্রিপ্ট নেটিং (Scrip Netting) বা ইন্ট্রা-ডে ট্রেডিং (Intra-day Trading) চালু করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রাথমিকভাবে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ব্লু-চিপ ইনডেক্স (DSE-30) ভুক্ত কোম্পানিগুলোর জন্য এই T+0 সুবিধা চালু হতে পারে। অথবা স্টক এক্সচেঞ্জ ভিন্ন কোন তালিকা ও দিতে পারে।
স্ক্রিপ্ট নেটিং বা ইন্ট্রা-ডে ট্রেডিং (T+0) কী?
সহজ কথায়, একই দিনে কোনো কোম্পানির শেয়ার কিনে আবার সেই দিনই বিক্রি করে দেওয়াকে ইন্ট্রা-ডে ট্রেডিং বা ডে-ট্রেডিং বলা হয়।
বর্তমান নিয়ম (T+2): বর্তমানে আপনি কোনো শেয়ার কিনলে তা আপনার অ্যাকাউন্টে (BO Account) এসে জমা হতে এবং ম্যাচিউর হতে ২ কার্যদিবস সময় লাগে। অর্থাৎ, আজ শেয়ার কিনলে তা তৃতীয় দিনের আগে বিক্রি করা যায় না।
নতুন নিয়ম (T+0): নতুন নিয়মে শেয়ার কেনার সাথে সাথেই তা বিক্রির যোগ্য হবে। অর্থাৎ, আপনি সকালে শেয়ার কিনে বিকালে বাজার বন্ধ হওয়ার আগেই তা লাভ বা লসসহ বিক্রি করে দিতে পারবেন। একেই বলে স্ক্রিপ্ট নেটিং।
এটি কীভাবে কাজ করে? (একটি বাস্তব উদাহরণ)
ধরুন, DSE-30 ইনডেক্সের অন্তর্ভুক্ত শেয়ার স্কয়ার ফার্মা শেয়ারের দাম সকালে বাজারের শুরুতে আছে ২০০ টাকা। আপনার ধারণা আজ এই শেয়ারটির দাম বাড়বে।
ধাপ ১: আপনি সকাল ১০:০০ টায় ২০০ টাকা দরে ১০০টি শেয়ার কিনলেন (মোট বিনিয়োগ ২০,০০০ টাকা)।
ধাপ ২: দুপুর ১২:০০ টায় দেখা গেল শেয়ারটির দাম বেড়ে ২১০ টাকা হয়েছে।
ধাপ ৩: আপনি আর দেরি না করে ২১০ টাকা দরেই আপনার ১০০টি শেয়ার বিক্রি করে দিলেন (মোট বিক্রয় মূল্য ২১,০০০ টাকা)।
ফলাফল: দিনে মোট ট্রেড হয়েছে ২০,০০০+২১,০০০=৪১,০০০ টাকা। ৫০ পয়সা হিসেবে ব্রোকারেজ হাউজের ২০৫ টাকা কমিশন বাদ দেওয়ার পর আপনার ১০০০-২০৫=৭৯৬ টাকা লাভ হলো।
ইন্ট্রা-ডে ট্রেডিং চালু হলে বিনিয়োগকারীরা বেশ কিছু সুবিধা পাবেন:
১) একই মূলধনে বারবার ট্রেড: আপনার কাছে মাত্র ২০,০০ টাকা থাকলে, আপনি দিনে ৩ বার বাই-সেল (মোট ৬ টি লেনদেন) করেই ১,২০,০০০+ টাকার ট্রেড ভলিউম জেনারেট করতে পারবেন। ফলে অল্প পুঁজিতেও বাজারের ট্রেড ভলিউম অনেক বাড়বে।
২) রাত্রিকালীন ঝুঁকি মুক্তি: বিশ্ববাজার বা দেশের রাজনৈতিক/অর্থনৈতিক কোনো নেতিবাচক খবর রাতে আসতে পারে, যা পরের দিন সকালে বাজারের উপর প্রভাব ফেলে। ডে-ট্রেডিংয়ে যেহেতু দিন শেষে আপনার কোনো শেয়ার হোল্ডিং থাকছে না, তাই রাতের কোনো খবরের কারণে লস হওয়ার ঝুঁকি থাকে না।
৩) অধিক কার্যকর স্টপ লস: শেয়ার কেনার পরেই যদি আপনার মনে হয় ভুল ট্রেড নিয়ে ফেলেছেন অথবা মূল্য পতনের কারণে স্টপ লস হিট করে তাহলে আপনি ঐ দিনই ট্রেড ক্লোজ করতে পারবেন। বর্তমানে টি+২ সেটেলমেন্টে ২ দিন পরে ট্রেড ক্লোজ করতে হয়। ফলে আপনি ৫%-১০% স্টপ লস নিতে চাইলেও অনেক ক্ষেত্রে তা ১০-১৫-২০% লসে পরিনত হয়ে যায়। ইন্ট্রা ডে ট্রেডিং চালু হলে এই সমস্যা মিটবে।
৪) বাজারের তারল্য (Liquidity) বৃদ্ধি: শেয়ারের কেনা-বেচা কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। ফলে বাজারে টাকার প্রবাহ বা ভলিউম বাড়বে, যা বাজারের জন্য ইতিবাচক।
৫) দ্রুত মুনাফা অর্জনের সুযোগ: দীর্ঘ সময় অপেক্ষা না করে প্রতিদিনের বাজার ওঠানামা থেকেই লাভ বের করে নেওয়া যায়।
ইন্ট্রা-ডে ট্রেডিং এর অসুবিধা ও ঝুঁকি: সুবিধার পাশাপাশি এই ধরণের ট্রেডিংয়ে চরম আর্থিক ঝুঁকিও রয়েছে। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের এই বিষয়গুলো অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে:
১) অধিক মানসিক চাপ ও ঝুঁকি: ডে-ট্রেডিংয়ে একই দিনে কয়েক বার ট্রেড করায় তা মানসিক চাপ তৈরি কিরতে পারে। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে গেলে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
২) ব্রোকারেজ কমিশন: আপনি যতবার কেনা-বেচা করবেন, ততবারই ব্রোকারেজ হাউজকে কমিশন দিতে হবে। তাই ছোটখাটো লাভে বারবার ট্রেড করলে লভ্যাংশের একটা বড় অংশ কমিশনেই চলে যেতে পারে।
৩) মার্কেট ট্রেন্ডের ওপর নির্ভরশীলতা: বাজার যদি টানা পতনশীল (Bearish) থাকে, তবে ইন্ট্রা-ডে ট্রেডিং করে লাভ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
৪ ) হুজুগে পড়ে লোকসান: না বুঝে হুটহাট শেয়ার কেনা-বেচা করলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের পুঁজি হারানোর সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে।
সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য কিছু জরুরি টিপস
যদি আপনি এই সুবিধাটি ব্যবহার করতে চান, তবে নিচের নিয়মগুলো মেনে চলা উচিত:
১. স্টপ-লস (Stop-Loss) ব্যবহার: লসের একটি সীমা নির্ধারণ করে রাখুন (যেমন: ২% দাম কমলেই বিক্রি করে দেওয়া)
২. আবেগ তাড়িত হওয়া: লোকসান রিকভার করার জন্য জোর করে বারবার ট্রেড করা যাবে না।
৩. টেকনিক্যাল অ্যানালাইসিস শেখা: শেয়ারের চার্ট, সাপোর্ট এবং রেজিস্ট্যান্স লেভেল দেখে ট্রেড করুন।
৪. গুজবে কান দেওয়া: কোনো গ্রুপ বা গুজবের ভিত্তিতে ডে-ট্রেডিং করা যাবে না।
৫. নির্দিষ্ট স্ক্রিপে নজর রাখা: যেহেতু শুরুতে শুধু DSE-30 কোম্পানির জন্য এটি চালু হচ্ছে, তাই ফান্ডামেন্টালি স্ট্রং শেয়ারেই ট্রেড করুন।
৬. অতিরিক্ত লিভারেজ (লোন) নেওয়া:ডে-ট্রেডিংয়ের জন্য মার্জিন লোন নেওয়া হবে চরম ঝুঁকিপূর্ণ।
স্ক্রিপ্ট নেটিং, ইন্ট্রা ডে ট্রেডিং বা T+0 সুবিধা বাংলাদেশের শেয়ার বাজারকে আন্তর্জাতিক মানের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। তবে সাধারণ বিনিয়োগকারী হিসেবে মনে রাখতে হবে—এটি কোনো লটারি বা রাতারাতি বড়লোক হওয়ার উপায় নয়। সঠিক জ্ঞান, শৃঙ্খলা এবং ধৈর্যের সাথে ট্রেড করলেই কেবল এই সুবিধা থেকে লাভবান হওয়া সম্ভব।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন