নতুন প্রজন্মের অনেক বিনিয়োগকারীই এখন ভালো ভালো দেশি-বিদেশি ব্লু-চিপ কোম্পানিতে সিস্টেমেটিক ইনভেস্টমেন্ট প্লান (এসআইপি) করছেন। যা আমাদের পুজিবাজারের জন্য ধীর্ঘ মেয়াদে ভাল লক্ষ্মণ।গত কয়েক দিনে নতুন অনেক বিনিয়োগকারীর পোর্টফলিও দেখার সুযোগ হয়েছে। সেগুল দেখে আমার মনে হয়েছে কিছু দিক নিয়ে আলাপ-আলোচনা করা প্রয়োজন। দেড় যুগের ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া শিক্ষাগুল আশা করি নতুনদের কাজে লাগবে। তাদেরকে আরো গভিরে গিয়ে চিন্তাভাবনা করার সুযোগ দিবে।
১) ওভার ডাইভার্সিফিকেশন:
নতুন বিনিয়োগকারী হিসেবে অবশ্যই আপনার পোর্টফলিও ডাইভার্সিফাই হতে হবে। তাতে আপনার রিস্ক মিনিমাইজেশন হবে। কিন্তু ডাইভার্সিফাই করতে গিয়ে অনেকেই ওভার ডাইভার্সিফাই করে ফেলছেন।
ললং-টার্ম বিনিয়োগকারী হিসেবে আপনাকে অবশ্যই নির্দিষ্ট কোম্পানি সম্পর্কে যথেষ্ট পরিমাণে জানতে হবে। বিগত ৩-৫ বছরের ফাইনান্সিয়াল অবস্থা কেমন ছিল? বর্তমানে কি অবস্থায় আছে? তাদের ভবিষ্যতে পরিকল্পনা কি? নতুন প্রডাক্ট বাজারে আসলে সেগুলোতে পাব্লিক রেস্পন্স কেমন। কোম্পানির মালিক পরিচালকদের ট্রেক রেকর্ড কেমন এগুল আপনাকে জানতেই হবে।
বর্তমানে আমাদের বাজারে একটা কোম্পানি ৩ টা আন-অডিটেড এবং ১ টা অডিটেড রিপোর্ট দেয়। যদি আপনার পোর্টফলিওতে ৫ টা স্টক থাকে তাহলেই আপনাকে বছরে ২০ টা রিপোর্ট বিস্তারিত ভাবে এনালাইসিস করতে হবে। তাহলে যাদের পোর্টফলিও তে ১৫-২০ স্টক তাদেরকে বছরে ৬০ থেকে ৮০ টা রিপোর্ট এনালাইসিস করতে হবে। ঐ কোম্পানি গুলোর বোর্ডে বসা ৫*২০=১০০ জনের বায়োডাটা ঘাটাঘাটি করতে হবে। ১৫-২০ টা কোম্পানির প্রডাক্ট যাচাই করেতে ৩০-৪০ টা দোকান ঘুরতে হবে। ১০০-২০০ কাস্টমারের সাথে প্রডাক্ট সেটিসফেকশন নিয়ে আলাপ-আলোচনা করতে হবে।
আমাদের দেশের ভাল ভাল ফান্ড ম্যানেজারদের ৫০-১০০ কোটির পোর্টফলিও তে আপনি ১৫-২০ টা স্টক খুজে পাবেন না। অথচ তাদের ম্যানেজমেন্ট টিমে হয়তো ৮-১০ জন আছে এই রিসার্চ গুল করার জন্য। সেখানে আপনি নতুন এক জন ব্যাক্তি বিনিয়োগকারী হয়ে কি ভাবে ১৫-২০ টা স্ক্রিপ হেন্ডেল করবেন? তাই ৩-৫ টা দিয়ে শুরু করুন এবং সম্ভব হলে ৭-১০ টা মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখুন।
২. ফান্ড এলোকেশন
নতুন বিনিয়োগকারী হিসেবে আপনার জানার সীমাবদ্ধতা থাকবে, অভিজ্ঞতা কম থাকবে এটাই স্বাভাবিক। সুতরাং শুরুতে আপনার উচিত হবে পোর্টফলিওর সব শেয়ারকে সমান সুযোগ দেয়া। ডাইভার্সিফাই করার জন্য আপনি ১০-১২ টা স্ক্রিপ্ট কিনেছেন। কিন্তু ফান্ড এলোকেশন ইউনিফর্ম না। দেখা যায় ৫ লাখ টাকার পোর্টফলিও তে ১০ টা স্টক। ২-৩ স্টকে লাখ টাকার বিনিয়োগ তো বাকি ৪-৫ টাতে ২০-৪০ হাজার।
এখন ২০-৪০ হাজার টাকা এলোকেশন পাওয়া স্টক যদি ডাবল হয় তাতে আপনার পুজি মাত্র ২০-৪০ হাজার টাকা বারবে। বিপরীতে লাখ টাকার এলোকেশন পাওয়া কোম্পানি যদি ১৫-২০% ডাউন হয় তাতেই আপনার ১৫-২০ হাজার টাকা আন-রিয়ালাউজ লস হয়ে যাবে, মেন্টাল প্রেসার বারবে।
তাই শুরুতে প্রতিটা স্টকে কাছাকাছি পরিমাণ ফান্ড এলোকেশ করুন। তাতে আপনার ১০ শেয়ারের পোর্টফলিওতে ৩-৪ টা খারাপ করলেও বাকি ৬-৭ টা ভাল করায় পুরো পোর্টফলিও তুলনামূলক ভাবে ভাল থাকবে। মেন্টাল পিস বজায়ে থাকবে।
৩. সেক্টর অথবা স্ক্রিপ্ট কনসেন্ট্রেশন
একটা নির্দিষ্ট স্টকে কিংবা একটা নির্দিষ্ট সেক্টরে ফান্ড কন্সেন্ট্রেশন করা তখনই সম্ভব যখন আপনি ঐ সেক্টর কিংবা স্ক্রিপ্ট সম্পর্কে যথেষ্ট জানবেন। ১০-১৫-২০ বছরের অভিজ্ঞ বিনিয়োগকারী অবশ্যই তার টপ ৩-৫ শেয়ার বাদ দিয়ে পছন্দের ৮-১০ নাম্বারে থাকা কোম্পানিতে বেশি টাকা বিনিয়োগ করবে না। সে পছন্দের লিস্টের প্রথম ৩-৫ টাতেই হয়তো ৬০-৭০% বিনিয়োগ রাখবে। বাকি ৫-৭ টায় অবশিষ্ট ৩০-৪০%।
নতুন কিংবা ২-৪ বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে নির্দিষ্ট কোন স্ক্রিপ্ট কিংবা সেক্টরের বিস্তারিত সব জেনে বুঝে ঝানু বিনিয়োগকারীদের মত কনভিকশন তৈরি হওয়া প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। মার্কেটে থাকার অভিজ্ঞতা আপনি বড় পুজি কিংবা বড় ডিগ্রি দিয়ে কাভারাপ করতে পারবেন না। মার্কেটে ১০-১৫-২০ বছর থেকেই আপনাকে অভিজ্ঞ হতে হবে। পোর্টফলিও তে ৫-১০ বছর একটা শেয়ার রেখেই তার নাড়ি-নক্ষত্র জানতে হবে।
সুতরাং নতুন হিসেবে বিশেষ কোন শেয়ারে কিংবা বিশেষ কোন সেক্টরে হাই-কন্সেন্ট্রেশন দেয়া যাবে না। যদি ৮ টা শেয়ারে বিনিয়োগ করেন তবে ৩-৪ টা সেক্টর বেছে নিয়। প্রতি সেক্টরের ২-৩ টা কোম্পানিতে এমন ভাবে বিনিয়োগ করুন যেন প্রতিটি শেয়ারে এবং প্রতিটা সেক্টরে কাছাকাছি পরিমাণ ফান্ড এলোকেশ হয়। যখন আপনি ১০-২০ বছরের অভিজ্ঞতা বাজারে থেকে, কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে অর্জন করবেন তখন হাই-কন্সেট্রেশন করবেন।
আশা করি আমার পরামর্শ গুল নতুনদের জন্য কিছু চিন্তাভাবনা করার খোরাক যোগাবে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন